জামালপুরে শিক্ষিকা জোবেদা আক্তার বিরুদ্ধে ভুয়া ঠিকানা দেখিয়ে সরকারি চাকরি নেওয়ার অভিযোগ
জামালপুর পৌর এলাকার চন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছাম্মৎ জোবেদা আক্তারের বিরুদ্ধে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে সরকারি চাকরি গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে জামালপুর সদর উপজেলার একটি স্থানীয় ঠিকানা দেখিয়ে তিনি ২০১০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। এরপর প্রায় দেড় যুগ ধরে সরকারি বেতন-ভাতা, পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও তার নিয়োগের সময় ব্যবহৃত ঠিকানার সত্যতা নিয়ে কখনো কার্যকর তদন্ত হয়নি।
স্থানীয় সূত্র, শিক্ষা বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি এবং অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষিকার প্রকৃত বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার চেচুয়া এলাকায়। তার পিতা মো. আবুল কাশেম ও মাতা মোছা. নূরুন্নাহার বেগম। কিন্তু সরকারি চাকরিতে আবেদনের সময় তিনি জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের একটি ঠিকানা ব্যবহার করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, যে ঠিকানাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছিল সেখানে জোবেদা আক্তার কিংবা তার পরিবারের কোনো সদস্যের কখনো বসবাসের রেকর্ড নেই।
স্থানীয়রা জানান, ওই এলাকায় তাদের কোনো বাড়িঘর, বসতভিটা বা স্থায়ী বসবাসের ইতিহাসও পাওয়া যায়নি। ফলে নিয়োগের সময় ব্যবহৃত ঠিকানার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে অভিযুক্ত শিক্ষিকার পারিবারিক পরিচয়। তার স্বামী মো. শফিকুল ইসলাম পাঠান জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা অফিসে তার স্বামী দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার কারণে তার প্রশাসনিক যোগাযোগ ও প্রভাবের সুযোগে বিষয়টি বছরের পর বছর আড়ালেই থেকে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষিকা জোবেদা আক্তার ২০১০ সালে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। সেই সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা ও বিভিন্ন সনদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরি পাওয়ার সুবিধার্থে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তা আর তদন্তের পর্যায়ে যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি প্রকৃতপক্ষে ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা হয়ে জামালপুরের স্থায়ী বাসিন্দা পরিচয়ে চাকরি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব সনদ, স্থায়ী বাসিন্দার প্রত্যয়নপত্র এবং অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। নিয়োগের সময় দেওয়া তথ্য পরে অসত্য প্রমাণিত হলে চাকরি বাতিলসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবে কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিতে ভুয়া সনদ, জাল কাগজপত্র ও ভুল তথ্য ব্যবহারের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান থাকলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনেক অভিযোগ তদন্তের আগেই চাপা পড়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হয়।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, “সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া ঠিকানা বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোছাম্মৎ জোবেদা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি, যারা অভিযোগ দিয়েছেন তাদের কাছে জেনে নিতে বলে ফোন কেটে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তার স্বামী ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কম্পিউটার অপারেটর মো. শফিকুল ইসলাম পাঠান বলেন, জোবেদা আক্তারের নান্দিনায় তার বাবার বাড়িও আছে, জমিও আছে। সব ঠিক আছে।
জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আহসান বলেন, বিষয়টি জানলাম। তবে মোছাম্মৎ জোবেদা আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র, স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, নাগরিকত্ব সনদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের রেকর্ড পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। সেই সাথে ভুয়া ঠিকানায় সরকারি চাকরি নেওয়ার অভিযোগে মোছাম্মৎ জোবেদা আক্তারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন স্থানীয়রা।
মেহেদী হাসান
জামালপুর।
২০-০৬-২০২৬
What's Your Reaction?