সংগ্রাম থেকে সুপারস্টার, ২৭ বছরের শাকিব খান অধ্যায়
সেলিম শাকিব
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী, তিনি শাকিব খান। একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র, দর্শকপ্রিয় জুটি, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার দক্ষতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শীর্ষস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা তাঁকে ঢালিউডের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ গোপালগঞ্জের একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর জন্মনাম মাসুদ রানা। পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জ হলেও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই মার্শাল আর্ট ও নাচের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। চলচ্চিত্রের নৃত্যপরিচালক আজিজ রেজার কাছে নাচ শেখার সময়ই পরিচালক আফতাব খান টুলুর সঙ্গে পরিচয় হয়। টুলু তাঁর ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিলেও নানা কারণে ছবিটির মুক্তি বিলম্বিত হয়।
এরই মধ্যে নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহানের ‘অনন্ত ভালোবাসা’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সোহানই তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন শাকিব খান। ১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পাওয়া এই ছবির মাধ্যমেই বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর কেটে গেছে ২৭ বছর, আর এই দীর্ঘ পথচলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নায়ক হিসেবে।
১৯৯৯–২০০২: সম্ভাবনার সূচনা
ক্যারিয়ারের শুরুতে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেন শাকিব খান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকের নজর কাড়তে সক্ষম হন। ২০০০ সালে শাবনূরের বিপরীতে ‘গোলাম’ ছবিতে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন। সে সময় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ২৫ হাজার টাকা। ছবিটি ব্যবসাসফল হওয়ার পর প্রযোজক অতিরিক্ত সম্মানী দেন বলেও সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
একই সময়ে পপি, পূর্ণিমাসহ তৎকালীন জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন। ‘গোলাম’, ‘দুজন দুজনার’, ‘আজকের দাপট’, ‘বন্ধু যখন শত্রু’, ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘নাচনেওয়ালী’ সহ একাধিক চলচ্চিত্র তাঁকে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০০৩–২০০৫: টিকে থাকার কঠিন সময়
এই সময়টিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার বিস্তার, মানসম্মত গল্পের সংকট এবং প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমে যাওয়ার কারণে পুরো শিল্পই কঠিন সময় পার করছিল। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া হাসিবুল ইসলাম মিজান পরিচালিত ‘আমার স্বপ্ন তুমি’ শাকিব খানের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর রসায়ন দর্শকদের ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং তিনি মূলধারার নির্ভরযোগ্য নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
২০০৬–২০১৩: শীর্ষে ওঠার গল্প
২০০৬ সাল ছিল শাকিব খানের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। প্রথমবার অপু বিশ্বাসের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘চাচ্চু’, ‘দাদিমা’ ও ‘পিতার আসন’- পরপর চারটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
২০০৭ সালে ‘তোমার জন্য মরতে পারি’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ২০০৮ সালে ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ‘তুমি স্বপ্ন তুমি সাধনা’, ‘এক টাকার বউ’ সহ একের পর এক হিট ছবি তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায়।
পরবর্তী বছরগুলোতে ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘মনে প্রাণে আছো তুমি’, ‘নিশ্বাস আমার তুমি’, ‘কিং খান’, ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, ‘খোদার পরে মা’, ‘ঢাকার কিং’, ‘মাই নেম ইজ খান’ এবং ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী’ সহ বহু ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেন তিনি।
২০১৪–২০১৫: মন্দার বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরের ফলে দেশের শতাধিক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে হিন্দি ছবি আমদানি নিয়ে বিতর্কে চলচ্চিত্রশিল্প আরও সংকটে পড়ে। এই সময় প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন শাকিব খান। তাঁর প্রযোজিত ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’ (২০১৪) বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। পরের বছর ‘লাভ ম্যারেজ’ ও বক্স অফিসে সফলতা পায়।
২০১৬–২০১৯ : নতুন রূপে প্রত্যাবর্তন
ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে শারীরিক ফিটনেস নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়লেও ২০১৬ সালে ‘শিকারি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুন রূপে ফিরে আসেন শাকিব খান। যৌথ প্রযোজনার এই চলচ্চিত্রটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, কলকাতাতেও ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ‘নবাব’, ‘সম্রাট’, ‘বসগিরি’, ‘সত্তা’, ‘চালবাজ’, ‘ভাইজান এলো রে’, ‘নাকাব’ সহ একাধিক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। একই সময়ে তাঁর প্রযোজিত ‘পাসওয়ার্ড’ ও ব্যবসাসফল হয়।
২০২০–২০২২: করোনার মধ্যেও কাজের ধারাবাহিকতা
করোনা মহামারিতে যখন দেশের সিনেমাহল বন্ধ, শুটিং স্থগিত এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন শাকিব খান নতুন চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন।
তাঁর প্রযোজিত ‘বীর’ মুক্তি পেয়ে সে সময়ের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। এরপর ‘নবাব এলএলবি’, ‘অন্তরাত্মা’, ‘গলুই’ ও ‘লিডার: আমিই বাংলাদেশ’-এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যান।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “চলচ্চিত্রের মানুষ দুই-তিন হাজার টাকা সাহায্যের চেয়ে কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান। তাই ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে গেছি।”
২০২৩–২০২৬: নতুন উচ্চতায় শাকিব খান
করোনা-পরবর্তী সময়ে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দেশের চলচ্চিত্র। সেই সময়েই মুক্তি পাওয়া ‘প্রিয়তমা’ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। এরপর ‘রাজকুমার’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’ এবং ‘তাণ্ডব’ সহ একাধিক আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের তারকাখ্যাতিকে আরও দৃঢ় করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ‘মেগাস্টার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতিরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা ও প্রত্যাবর্তন
সাফল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বিতর্ক ও সাংগঠনিক জটিলতারও মুখোমুখি হয়েছেন শাকিব খান। ২০১১ সালে প্রদর্শক সমিতির সঙ্গে বিরোধের জেরে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং ২০১৭ সালে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা দুই ঘটনাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি আবারও নিয়মিতভাবে কাজ শুরু করেন।
অর্জনের খাতা l দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শাকিব খান চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। পাশাপাশি পেয়েছেন মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মাননা।
এক অনন্য অধ্যায়ের নাম
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক এসেছেন, গেছেন কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে দর্শকপ্রিয়তা, বক্স অফিস সাফল্য এবং শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান ধরে রাখার নজির খুব কমই আছে। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া, নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও চলচ্চিত্রশিল্পে সক্রিয় থাকা এই বৈশিষ্ট্যগুলোই শাকিব খানকে আলাদা করেছে সমসাময়িকদের থেকে।
২৭ বছরের এই যাত্রা তাই শুধু একজন নায়কের ক্যারিয়ারের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রের উত্থান, সংকট ও পুনর্জাগরণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
What's Your Reaction?