কীর্তনখোলার তীরে মাঝিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি: স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ আদালতের

Jul 14, 2026 - 20:07
 0  7
কীর্তনখোলার তীরে মাঝিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি: স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ আদালতের

নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল | 

বরিশাল মহানগরীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ত্রিশ গোডাউন এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের মাঝিদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঘটনাটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করার পর বিচারক নিজেই গোপনে ভিডিও ধারণ করেন এবং সেই ভিডিওসহ প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস এস. এম. শরিয়ত উল্লাহর কার্যালয় থেকে জারিকৃত এক আদেশে কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একজন উপযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদী করে অবিলম্বে নিয়মিত মামলা (এফআইআর) রেকর্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ১৫ মিনিটে বিচারক ব্যক্তিগতভাবে বরিশাল মহানগরীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় অবস্থানকালে পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের মাঝিদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি ঘটনাটির ভিডিও গোপনে ধারণ করেন, যা মামলার নথিতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মাঝির সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন প্রতিটি নৌকা ও ট্রলার থেকে ৫০ টাকা করে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে আসছে। কোনো মাঝি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নদীতে নৌকা নামাতে বাধা দেওয়া হয়। অনেক সময় ভয়ভীতি প্রদর্শন, গালিগালাজ এবং মারধরেরও শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় নৌকা চালানো এক বৃদ্ধ মাঝি আদালতের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, আগে কখনো এ ধরনের চাঁদাবাজির মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। প্রতিদিনের সামান্য আয়ের একটি অংশ চাঁদা হিসেবে চলে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ত্রিশ গোডাউন বরিশালের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী কীর্তনখোলা নদীতে নৌভ্রমণের জন্য এখানে আসেন। মাঝিদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের কারণে তারা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে বাধ্য হন। এর ফলে পর্যটকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বরিশালের পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আদালতের মতে, চাঁদাবাজি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা জরুরি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ঘটনাটিতে দণ্ডবিধির ৩৮৫ ধারায় ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের অভিযোগের উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায়ও মামলা গ্রহণের পর্যাপ্ত ভিত্তি রয়েছে। তাই কোতয়ালি মডেল থানাকে দ্রুত এফআইআর গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, তাদের সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক এবং দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম পরিচালনার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে আদালতের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় মাঝি, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আদালতের এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আইনজীবীদের মতে, কোনো বিচারক নিজে প্রত্যক্ষ করা অপরাধের বিষয়ে আইনের বিধান অনুযায়ী স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। বরিশালের এই ঘটনাটি জনস্বার্থে বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow