অবশেষে গ্রেপ্তার নিয়ে মুখ খুললেন পরীমনি
পাঁচ বছর আগে রাজধানীর বনানীর বাসায় র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি’ বলে দাবি করেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত অভিনেত্রী পরীমনি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ২০২১ সালের ৪ আগস্টের সেই অভিযান, গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও কারাবাস নিয়ে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি। পরীমনির দাবি, তাকে ‘বিশেষ মহলের স্বার্থে’ এবং ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা থেকে বিরত ছিলেন পরীমনি। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও টকশোতে এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেও তিনি বলেছিলেন, সময় হলে এ বিষয়ে লিখবেন। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন এই অভিনেত্রী।
পোস্টের শুরুতেই র্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানান পরীমনি। সম্প্রতি একটি অনলাইন টকশোতে দেওয়া তার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে অভিনেত্রী লেখেন, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছে যে, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীতে তার বাসায় দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর পর তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে তাকে অন্যায়ভাবে ও সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পরীমনির ভাষ্য, গ্রেপ্তারের পর তাকে একটি মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং টানা ২০ দিন কারাগারে থাকতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি লিখেছেন, “সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করেছে, তা আল্লাহ আর আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারও পক্ষে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তবুও আমি বিশ্বাস করি, সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়। সময় লাগতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরদিন চাপা রাখা যায় না।”
অভিনেত্রীর দাবি, গ্রেপ্তারের দিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি সেই ঘটনার ভুক্তভোগী হিসেবেই জীবন কাটাচ্ছেন। তার অভিযোগ, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীকে ব্যবহার করে একজন নারী শিল্পীর জীবনকে বিপর্যস্ত করা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একাধিক প্রশ্নও তুলেছেন পরীমনি। তিনি জানতে চান, যদি আদালত তাকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেনও, তাহলে হারিয়ে যাওয়া সম্মান, মানসিক শান্তি এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কি আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব?
তার ভাষায়, “মানুষের মনে আমাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে? রাষ্ট্রের কাছে আমি এই প্রশ্নগুলোর জবাব চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কখনো চাইনি আমার পরিচয় একজন বিতর্কিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। আমি সব সময় একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বেঁচে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু একটি ঘটনার অভিঘাত আমার জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার দায়ভার আজও আমাকে বহন করতে হচ্ছে।”
পরীমনি জানিয়েছেন, তার অবস্থান কোনো প্রতিশোধের নয়; বরং সত্য, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পক্ষে। তিনি লেখেন, “এতগুলো দিন পর আমি কোনো ক্ষোভ বা প্রতিশোধের কথা বলতে চাই না। আমি শুধু সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার পক্ষে কথা বলতে চাই। আমি চাই, ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এ ধরনের অন্যায়ের শিকার না হন।”
রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
কঠিন সময়ে পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু, সাংবাদিক ও ভক্তদের পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পরীমনি। তিনি বলেন, তাদের ভালোবাসা ও সমর্থনই তাকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
পোস্টের শেষদিকে অতীতের ক্ষত ভুলে নতুনভাবে বাঁচার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এই অভিনেত্রী।
তিনি লেখেন, “আমি অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে চাই না। আমি মুক্ত আকাশে পরীর মতো করেই উড়তে চাই। আমার কাজ, আমার সন্তান, আমার পরিবার এবং দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চাই।”
সবশেষে সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি লেখেন, “আমি যেন আরও ভালো কাজের মাধ্যমে আপনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারি।”
২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর বনানীতে পরীমনির বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরদিন বনানী থানায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন র্যাব-১-এর কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান।
র্যাবের জব্দ তালিকায় পরীমনির বাসা থেকে মদ, আইস ও এলএসডিসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধারের দাবি করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তৎকালীন র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন দাবি করেছিলেন, পরীমনির বাসায় একটি ‘মিনি বার’ ছিল এবং তার মদের লাইসেন্সের মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
গ্রেপ্তারের পর তিন দফা রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ নিয়ে হাইকোর্টও প্রশ্ন তোলে। পরে ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট বিচারিক আদালত তার জামিন মঞ্জুর করলে পরদিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
তদন্ত শেষে একই বছরের ৪ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পরীমনিসহ তিনজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য, নড়াইলের মেয়ে শামসুন্নাহার স্মৃতি ২০১৫ সালে ‘পরীমনি’ নামে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিষেক করেন। এরপর দুই ডজনের বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজেও অংশ নিয়েছেন তিনি। গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগে ঢাকা বোট ক্লাবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলেন এই অভিনেত্রী।
What's Your Reaction?