নকল চিত্রনাট্যের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে বাংলা সিনেমা

Mar 27, 2026 - 16:17
Jul 26, 2026 - 16:19
 0  2
নকল চিত্রনাট্যের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে বাংলা সিনেমা

সেলিম শাকিব
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেছে। আধুনিক সিনেমা ক্যামেরা, উন্নত ভিএফএক্স, ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড, অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতির বিস্তার এবং আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশের উন্নয়ন দেশের সিনেমাকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে গেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছে, যা চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেও একটি বড় সংকট এখনো কাটেনি, মৌলিক গল্প ও শক্তিশালী চিত্রনাট্যের অভাব।

দেশের অনেক নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার এখনো বিদেশি সিনেমার গল্প, চরিত্র, দৃশ্য কিংবা নির্মাণশৈলী অনুসরণ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। দক্ষিণ ভারতের কোনো সিনেমা, বলিউড কিংবা হলিউডের কোনো চলচ্চিত্র আলোচনায় এলেই তার আদলে দেশীয় সিনেমা নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কেজিএফ, পুষ্পা, অ্যানিমেলসহ বিভিন্ন আলোচিত সিনেমার সাফল্যের পর গত কয়েক বছরে বাংলাদেশেও একই ধরনের গল্প, চরিত্র ও অ্যাকশন নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা নির্মাণশৈলী, প্রিয় তারকার উপস্থিতি বা অভিনয়ের কারণে ব্যবসায়িক ভাবে কিছুটা সফল হলেও অধিকাংশ চলচ্চিত্র দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কারণ দর্শক এখন আর আগের মতো সীমাবদ্ধ নন। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সিনেমা এখন হাতের মুঠোয়। ফলে বিদেশি সিনেমার গল্প বা দৃশ্য সামান্য পরিবর্তন করে নতুন নামে উপস্থাপন করলে সেটি সহজেই দর্শকের কাছে ধরা পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন চলচ্চিত্র ভিত্তিক গ্রুপ গুলোতে দেশীয় চলচ্চিত্রে নিয়ে আলোচনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দর্শক এখন সিনেমার গল্প, চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলী নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। শুধু বিনোদন নয়, তারা নতুনত্বও খোঁজেন। তাই গল্প, চরিত্র, সংলাপ কিংবা দৃশ্যায়নে বিদেশি সিনেমার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলে দর্শক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে দ্রুতই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। এর প্রভাব পড়ে বক্স অফিসেও। চলতি বছরে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা গণমাধ্যমে নেতিবাচক দর্শক প্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক বড় বাজেটের সিনেমাও প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি।

অবশ্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পেও রিমেক বা সাহিত্য ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচলন রয়েছে। বলিউড, তামিল কিংবা তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়মিত রিমেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বত্ব (রাইটস) কিনে গল্পকে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ করা হয়। ঠিক এই বিষয়টি বাংলাদেশে অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, একটি সিনেমার প্রাণ তার গল্প ও চিত্রনাট্য। প্রযুক্তি, বড় বাজেট, জনপ্রিয় তারকা কিংবা চমকপ্রদ অ্যাকশন কোনো সিনেমাকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে পারে না, যদি তার ভিত্তি দুর্বল হয়। ইতিহাস বলছে, সীমিত বাজেটের অনেক চলচ্চিত্র কেবল শক্তিশালী গল্প ও বিশ্বাসযোগ্য চিত্রনাট্যের কারণে দর্শকের হৃদয় জয় করেছে। আবার বিপুল বাজেটের অনেক সিনেমা দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে মুক্তির পরপরই হারিয়ে গেছে।

বাংলাদেশে মৌলিক গল্পের কোনো সংকট নেই। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গ্রামীণ জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা, লোককাহিনি, ইতিহাস, প্রেম কিংবা সমসাময়িক নানা ঘটনাকে ঘিরে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন কেবল গবেষণা ভিত্তিক চিন্তা, সৃজনশীল উপস্থাপন এবং দক্ষ চিত্রনাট্য নির্মাণ। এমন গল্পই দর্শক দেখতে চান, যা তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে চলচ্চিত্রে অযথা সহিংসতা, অশালীনতা কিংবা অপ্রয়োজনীয় সংলাপের পরিবর্তে সুস্থ বিনোদনকে প্রাধান্য দিয়ে নির্মিত পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধারণ করে নির্মিত চলচ্চিত্র এখনো দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য, দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসই তার প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি, স্ক্রিপ্ট ল্যাব নির্মাণ এবং চিত্রনাট্য কর্মশালা আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযোজকদেরও মৌলিক গল্পে বিনিয়োগের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শুধু বিদেশি সিনেমার সাফল্য দেখে একই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে চলচ্চিত্র শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠন গুলোরও কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি। মৌলিক চিত্রনাট্যকে উৎসাহ দেওয়া, নতুন লেখকদের সুযোগ সৃষ্টি, কপিরাইট আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করলে চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী হবে।

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের বিশ্বাস, ভালো সিনেমার জন্য দর্শকের আগ্রহ কখনো কমে না। সাম্প্রতিক সময়েও কয়েকটি মৌলিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র তার প্রমাণ দিয়েছে। তাই সময়ের দাবি একটাই, নকলের সহজ পথ ছেড়ে মৌলিক চিন্তা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার ওপর আস্থা রাখা। কারণ প্রযুক্তি সিনেমাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে দেয় কেবল একটি শক্তিশালী গল্প এবং পরিপূর্ণ চিত্রনাট্য। আর সেই পথেই ফিরতে পারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সুদিন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

SalimShakib সেলিম শাকিব একজন তরুণ সাংবাদিক, অনলাইন ফিল্ম অ্যাক্টিভিস্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রভিত্তিক জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘বিডি ফিল্মবাজ’-এর টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি নির্মাণ ক্ষেত্রেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন।