মৌলিকতার সংকটে বাংলা সিনেমার গান
সেলিম শাকিব
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের চিত্রগ্রহণ এবং বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান 'গান' নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। একসময় একটি চলচ্চিত্রের গান মুক্তির আগেই দর্শকের মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করত। এখন সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। বরং সাম্প্রতিক সময়ে অনেক চলচ্চিত্রের গান মৌলিকতার অভাব, দুর্বল গীতিকবিতা, বিদেশি গানের অনুকরণ এবং অতিরিক্ত আবেদনময়ী উপস্থাপনার অভিযোগে আলোচনায় আসছে।
একটি সিনেমার সাফল্যে গানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো একটি গান যেমন চলচ্চিত্রের প্রচারণাকে এগিয়ে নেয়, তেমনি দর্শকের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘তুমি আমার জীবন’, ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ‘ও প্রিয়তমা’, ‘চলো নিরালায়’ এবং ‘কখনো রোদ তুমি কখনো জোৎস্না’ সহ বেশকিছু গান শুধু সিনেমার জনপ্রিয়তাই বাড়ায়নি, আলাদা পরিচয়ও তৈরি করেছে।
তবে চলচ্চিত্র প্রেমীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক সিনেমার গান গল্পের প্রয়োজনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তৈরি হচ্ছে। ফলে গানের কথার সৌন্দর্য, সুরে নতুনত্ব এবং সংগীতায়োজনে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক গান মুক্তির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দর্শকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো মৌলিকতার সংকট। বিভিন্ন সময় নতুন চলচ্চিত্রের গান বিদেশি কিংবা অন্যান্য ভাষার গানের সুর, সংগীতায়োজন বা উপস্থাপনার সঙ্গে মিল থাকার অভিযোগে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এমন বিতর্ক বারবার সামনে আসায় প্রায়ই মৌলিক সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব বাড়ানোর দাবি উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ডিজিটাল যুগে কোনো সুর বা সংগীতায়োজন গোপন রাখা সম্ভব নয়। তাই অনুকরণের পরিবর্তে সৃজনশীলতাই হতে পারে বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গানের ভাষা ও উপস্থাপনা। অনেক সময় কিছু গানে দ্ব্যর্থবোধক শব্দ, অতিরিক্ত আবেদনময়ী নৃত্য কিংবা তথাকথিত ‘আইটেম সং’-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেখা যায়। এতে দর্শকের একটি অংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখার সংস্কৃতির সঙ্গে এমন উপস্থাপনা অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
কণ্ঠশিল্পী নির্বাচন নিয়েও রয়েছে সমালোচনা। অনেক সময় অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের কণ্ঠ নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীর পর্দার উপস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না বলে মন্তব্য করেন অনেক দর্শক। চলচ্চিত্রের চরিত্র, বয়স, আবহ এবং অভিনয়ের ধরন বিবেচনায় রেখে কণ্ঠ নির্বাচন করলে গান আরও বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন সিনেমাপ্রেমীরা।
একটি চলচ্চিত্রের গান কেবল বিনোদনের জন্য নয়; এটি গল্পের আবেগ, চরিত্রের বিকাশ এবং দর্শকের সঙ্গে সিনেমার মানসিক সংযোগ তৈরির অন্যতম মাধ্যম। তাই গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও নির্মাতাদের সমন্বিত পরিকল্পনায় গল্পনির্ভর, অর্থবহ এবং শ্রুতিমধুর গান নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্বল্প সময়ের প্রচারণা নয়, বরং বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে ফিরবে এমন গানই একটি চলচ্চিত্রের প্রকৃত সম্পদ।
বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের রুচি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতার সমন্বয়ে নতুন ধারার গান নির্মাণই হতে পারে সময়ের দাবি। নতুন গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালকদের সুযোগ সৃষ্টি, কপিরাইটের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় অশ্লীলতার পরিবর্তে রুচিশীল উপস্থাপনায় গুরুত্ব দিলে বাংলা চলচ্চিত্রের গান আবারও দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে। আর সেই পরিবর্তনই বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
What's Your Reaction?