নতুন তারকার সংকটে বাংলা চলচ্চিত্র
সেলিম শাকিব
একসময় বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন তারকার আবির্ভাব ছিল যেন সময়েরই নিয়ম। এক প্রজন্মের জনপ্রিয়তার আলো ম্লান হওয়ার আগেই উঠে আসতেন আরেকজন। নায়ক রাজ রাজ্জাক থেকে সোহেল রানা, আলমগীর, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না এবং সবশেষে শাকিব খান; প্রতিটি সময়ই পেয়েছে নিজস্ব জনপ্রিয় তারকাকে, যাদের নামই ছিল দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু গত প্রায় দুই দশকে সেই ধারাবাহিকতায় যেন ছেদ পড়েছে। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্পীর আগমন ঘটলেও শাকিব খানের পর এমন কোনো তারকার উত্থান হয়নি, যিনি একাই একটি চলচ্চিত্রের প্রধান বিক্রয়শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছেন। তাহলে নতুন সুপারস্টার না জন্মানোর দায় কার! শিল্পীর, নাকি পুরো চলচ্চিত্র শিল্পের?
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৬ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ নায়কের অবস্থান ধরে রেখেছেন শাকিব খান। অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমার মাধ্যমে তিনি নিজেকে দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পেয়েছেন সুপারস্টার থেকে মেগাস্টার তকমা। প্রযোজক, পরিবেশক ও হল মালিকদের কাছেও তার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বড় বাজেটের অধিকাংশ ছবিই এখনও তাকে ঘিরেই পরিকল্পিত হয়।
অথচ এই সময়ে নতুন মুখের অভাব ছিল না। ইমন, নিরব, আরিফিন শুভ, বাপ্পি চৌধুরী, সাইমন সাদিক, সিয়াম আহমেদ, শরিফুল রাজ, আদর আজাদ এবং সাম্প্রতিক সময়ে আফরান নিশো। প্রত্যেকেই অভিনয়ের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের কয়েকটি চলচ্চিত্র দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিক বক্স অফিস সাফল্য, দীর্ঘমেয়াদি জনপ্রিয়তা এবং এককভাবে দর্শক টানার ক্ষমতার দিক থেকে তারা এখনও স্থায়ী 'স্টার পাওয়ার' তৈরি করতে পারেননি বলে মনে করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের অনেকে।
এ অবস্থার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। অনেক সম্ভাবনাময় শিল্পী একটি বা দুটি সফল চলচ্চিত্রের পর আর ধারাবাহিকভাবে মানসম্মত কাজের সুযোগ পান না। শক্তিশালী চিত্রনাট্য, বৈচিত্র্যময় চরিত্র এবং দক্ষ পরিচালকের সঙ্গে নিয়মিত কাজের সুযোগের অভাবও তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ কঠিন করে তোলে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ক্যারিয়ারের গতি ধরে রাখতে পারেন না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতি। বিশ্বের বড় চলচ্চিত্র শিল্পে একজন অভিনয় শিল্পীকে তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করা হয়। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি গণমাধ্যম, প্রচারণার মাধ্যমে তার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে সেই পরিকল্পিত স্টার তৈরির সংস্কৃতি এখনও শক্ত ভিত্তি পায়নি।
একসময় নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও ছিল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কর্মসূচির মাধ্যমে মান্না, দিতি, সোহেল চৌধুরী, মিশা সওদাগর, অমিত হাসান ও আমিন খানের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ থাকলেও নিয়মিত প্রতিভা অন্বেষণ, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সংস্কৃতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এদিকে দর্শকের রুচিও বদলে গেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং বিদেশি চলচ্চিত্রের সহজলভ্যতার কারণে দর্শক এখন শুধু তারকাখ্যাতি নয়, অভিনয়ের গভীরতা, চিত্রনাট্যের মান, চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নির্মাণশৈলীকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শুধুমাত্র জনপ্রিয় মুখ বা সুদর্শন উপস্থিতি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী তারকা হয়ে ওঠা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
সংকট শুধু নায়ক-নায়িকার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। শক্তিশালী খলনায়ক, চরিত্রাভিনেতা ও কৌতুক অভিনেতার নতুন মুখও খুব কম উঠে আসছে। অথচ একসময় এসব শিল্পী একটি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা ও গল্পের শক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। এই ঘাটতি পুরো শিল্পের ভারসাম্যকেই প্রভাবিত করছে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন তারকা তৈরি করতে হলে কেবল একটি সিনেমায় সুযোগ দিলেই হবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র, অভিনয় প্রশিক্ষণ, পরিকল্পিত প্রচারণা এবং নতুন শিল্পীদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একই সঙ্গে নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক ও হল মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বর্তমানে পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের তারকা তৈরি করতে না পারলে এই অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পাবে না। কারণ একটি শিল্প দীর্ঘদিন একই মুখের ওপর নির্ভর করে টেকসইভাবে এগোতে পারে না। আগামী দিনের বাংলা চলচ্চিত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এখনই নতুন প্রতিভা আবিষ্কার, বিকাশ এবং পরিকল্পিতভাবে তারকা হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
What's Your Reaction?