দর্শক হারাচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ, পরিবেশ উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি
সেলিম শাকিব
দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন নতুন সিনেমা নির্মাণ, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক দর্শক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরের সিনেপ্লেক্সে নতুন সিনেমা মুক্তির সময় দর্শকের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক হলেও, দেশের অধিকাংশ জেলা ও মফস্বল এলাকার সিনেমা হল এখনও দর্শকশূন্যতার সঙ্গে লড়াই করছে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ভালো সিনেমা নির্মাণ করলেই হবে না, দর্শকদের জন্য নিরাপদ ও পরিবারবান্ধব প্রেক্ষাগৃহ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
একসময় সিনেমা হল ছিল বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যম। নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে হলে যাওয়ার সংস্কৃতি ছিল বেশ স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক সিনেমা হলের অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অস্বস্তিকর আসন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অভাব, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকা এবং শৃঙ্খলার ঘাটতির কারণে অনেক দর্শক, বিশেষ করে পরিবার ও নারী দর্শক, প্রেক্ষাগৃহে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
চলচ্চিত্রভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ ও দর্শকদের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলা চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শকদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী তরুণ। ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে পরিবার ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শকদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও বছরের বাকি সময়ে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে উৎসবের বাইরে অধিকাংশ সিনেমাই প্রত্যাশিত দর্শক পায় না।
দর্শকদের অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশগত সমস্যা। ধূমপান নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক হলে প্রকাশ্যেই ধূমপান করা হয়। কোথাও কোথাও অসামাজিক আচরণ, উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি, অশালীন মন্তব্য এবং নারী দর্শকদের প্রতি হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে অনেকেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে সিনেমার দৃশ্য ধারণ বা ভিডিও রেকর্ড করার প্রবণতা কেবল কপিরাইট লঙ্ঘনই নয়, অন্যান্য দর্শকের সিনেমা উপভোগের অভিজ্ঞতাকেও ব্যাহত করে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শকদের একাংশের মতে, ঢাকার আধুনিক সিনেপ্লেক্সগুলোতে ভালো সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শকের চাপ তৈরি হয়। তবে মফস্বলের অধিকাংশ সিনেমা হলে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক শোতে দর্শকসংখ্যা ১০ থেকে ৫০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক হল মালিক লোকসানের কারণে শো কমিয়ে দেন বা বছরের দীর্ঘ সময় হল বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশে এক হাজারেরও বেশি সিনেমা হল চালু থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে শ’খানেকের ঘরে।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দর্শক ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন ও মানসম্মত সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ধূমপান ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন, নারী ও পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অসামাজিক আচরণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া, মোবাইলে ভিডিও ধারণ বন্ধে কার্যকর নজরদারি, আধুনিক ও আরামদায়ক আসন স্থাপন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং টিকিটের মূল্য যৌক্তিক ও স্বচ্ছ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু ভালো সিনেমার ওপর নির্ভর করছে না; বরং দর্শক যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সিনেমা উপভোগ করতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও আধুনিক প্রেক্ষাগৃহই পারে পরিবারকে আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনতে। চলচ্চিত্রের মানোন্নয়নের পাশাপাশি যদি প্রেক্ষাগৃহ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে দেশের সিনেমা শিল্প আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ও দর্শকপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে।
What's Your Reaction?