নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ
জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (বিআরআইইউ)-তে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসরণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, সব নিয়োগই বিধি মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, পরিচালক (পাবলিক রিলেশন) পদে বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী গোলাম মাওলা গত বছরের ১৬ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পদে দায়িত্ব গ্রহণের আগে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন আহ্বান, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা কিংবা প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বর্তমান রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জোবায়দুল ইসলামের নিয়োগ নিয়েও। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনিও একই দিনে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার ক্ষেত্রেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন গ্রহণ, সাক্ষাৎকার বা নিয়োগ বোর্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে রেজোয়ান নীলিমের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এ নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। নিয়োগ কমিটির কাছেও এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু নিয়োগ শূন্য পদ ছাড়াই দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জামালপুরের জসিম উদ্দিন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। আরও একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রয়াত ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. শহীদুর রহমান খানের বাসায় দীর্ঘদিন ধরে গৃহকর্মীর দায়িত্ব পালনকারী অনিতা রবিদাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিত বেতন গ্রহণ করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে চেয়ারম্যানের বাসায় দায়িত্ব পালন করলেও তার বেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা আর্থিক অনিয়মের শামিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব বিতর্কিত নিয়োগ ও বেতন বাবদ প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যার আর্থিক দায় বহন করছে বিশ্ববিদ্যালয়। নিয়োগসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়োগ কমিটির কাছেও নেই বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন বা আত্মগোপনে চলে যান। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় কিছু সভা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হলেও পরে অনেক সদস্যের কাছ থেকে আলাদাভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বে দেওয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে রেজুলেশন প্রস্তুত করা হয়েছে, অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না। এ বিষয়ে কয়েকজন ট্রাস্টি বোর্ড ও নিয়োগ কমিটির সদস্য নিজেদের প্রতারিত হওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (পাবলিক রিলেশন) গোলাম মাওলা। তিনি বলেন, "নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জাতীয় পত্রিকায় না দিয়ে বিডিজবসে প্রকাশ করা হয়েছিল। আমার ক্ষেত্রে নিয়োগ নয়, পদায়ন করা হয়েছে।" অনিতা রবিদাসের বিষয়ে তিনি বলেন, "তিনি প্রয়াত চেয়ারম্যানের বাসায় দায়িত্ব পালন করলেও তার বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রতি মাসে চেয়ারম্যানের স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে অনুদান হিসেবে প্রদান করেন।" এছাড়া অন্যান্য সব নিয়োগও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসরণ করে ও ট্রাস্টি বোর্ডকে জানিয়েই সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগসংক্রান্ত সব নথিপত্র পর্যালোচনা করে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। মেহেদী হাসান জামালপুর। ১০-০৭-২০২৬
What's Your Reaction?