ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের মামলায় ৩ জনের আমৃত্যু ও ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড
মনসুর আহাম্মেদ ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
॥ ঠাকুরগাঁওয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর আগে এক স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদন্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, সদর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের ইউনুস কসাইয়ের ছেলে মো. আনিস রানা (৩৫), মুসলিমনগর গ্রামের মাইরুদ্দিনের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম (৪০) এবং একই গ্রামের ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল (৪৮)। রায় ঘোষণার সময় আনিস রানা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মুসলিমনগর গ্রামের মো. সেলিমের ছেলে মো. আনিছুর (২৯), বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর ওরফে খতু (৩২) এবং বজলুর ছেলে মো. লালু (২৬)।
রায়ের বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির প্রত্যেককে ২ লক্ষ টাকা করে এবং যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা করে অর্থদন্ড করা হয়েছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করবেন। এছাড়া আদালত জানিয়ে দিয়েছেন, আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫ (এ) ধারা বা জেল কোডের বিধান অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশন সুবিধা পাবেন না। আসামিদের এই অর্থদন্ড ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে দন্ডিতদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করে সেই অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দক্ষিণ সালন্দর গ্রামে বান্ধবীর বাসা থেকে নিজ বাড়ি ফেরার পথে এনামুল পেট্রোল পাম্পের পেছনে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে মুখ চেপে ধরে অপহরণ করা হয়। পরে পাম্পের পেছনে বাঁশ হাটের পাশে একটি মোবাইল টাওয়ারের নিচে নিয়ে আসামিরা তাকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে এবং অন্য আসামিরা এতে সহায়তা করে। ভিকটিমের চিৎকারে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসলে আসামিরা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভিকটিমকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর ২৪ অক্টোবর ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই রায় প্রকাশ করা হলো।
আদালতের এই রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল বলেন, "দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর পর ভিকটিম ও তার পরিবার কাঙ্খিত ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়, যা সমাজে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা দেবে। বিশেষ করে, আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্তরা জেলে কোনো ধরনের রেমিশন বা সাজা মওকুফের সুবিধা পাবেন না এবং আসামিদের সম্পত্তি নিলাম করে ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে আদেশ আদালত দিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট।"
রায়ের কার্যকরী অংশ পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঠাকুরগাঁও বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। আদালত চত্বরে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. মেহেদী হাসান ও মো. দিদার আলী।
What's Your Reaction?