পলাতক চেয়ারম্যানের ভূতুড়ে ক্ষমতা! জাল স্বাক্ষরে ‘খাস পুকুর’ দখলের অভিযোগ

Apr 22, 2026 - 15:17
 0  12
পলাতক চেয়ারম্যানের ভূতুড়ে ক্ষমতা! জাল স্বাক্ষরে ‘খাস পুকুর’ দখলের অভিযোগ

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের পিঙ্গলহাটি গ্রামে একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে চরম বিতর্ক, উত্তেজনা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসন কর্তৃক সরেজমিন পরিমাপ করে ইজারাদারদের বুঝিয়ে দেওয়ার পরও হঠাৎ করে পলাতক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নামে সেখানে ‘খাস পুকুর’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানানোও হয়েছে। এতে করে বিপাকে পড়েছেন বৈধ ইজারাদাররা। জানা গেছে, পিঙ্গলহাটি মৌজার দাগ নং ২২৮/৪৪২-এর আওতাধীন প্রায় ০.৬২ শতাংশ আয়তনের ওই পুকুরটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত ও পরিমাপ শেষে পুকুরটি এক পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু গত বছর ৯ ডিসেম্বর দুপুরে হঠাৎ করেই ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সেখানে একটি নতুন সাইনবোর্ড টানানো হয়। সাইনবোর্ডে পুকুরটিকে ‘খাস পুকুর’ হিসেবে উল্লেখ করে মালিকানা শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের নামে দাবি করা হয়। এতে চেয়ারম্যান হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে রফিকুল ইসলাম আলমের, যিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে, শাহজাদী বেগম ওয়াকফ স্টেটের দাবি অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে পুকুরটি সৈয়দা নাজনীন ও মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে পাঁচ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৩ জুন জেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ওয়াকফ শাখার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুকুরটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইজারাদারদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ইজারাদার সৈয়দা নাজনীন বলেন, “আমাদের কাছে বৈধ সব কাগজপত্র রয়েছে। প্রশাসনের উপস্থিতিতে মাপজোক করে পুকুরটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা পুকুর খনন ও সংস্কারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে আমাদের সাইনবোর্ড ঢেকে নতুন বোর্ড টানানো হয়েছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম তার কাছে পুকুর ইজারা সংক্রান্ত বিষয়ে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। পরে আর্থিক সংকটের কারণে তিনি ২০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। এরপরও অসৎ উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে আমিনুল ইসলাম মেলান্দহ উপজেলার ৭ নং চরবাণিপাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্বে রয়েছেন। এদিকে, পলাতক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম আলমের নামে সাইনবোর্ড টানানোর ঘটনায় নতুন করে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তার অনুপস্থিতির সুযোগে ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক এই কর্মকর্তা ও দুইজন ইউপি সদস্য তার স্বাক্ষর জাল করে এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, চেয়ারম্যান আত্মগোপনে থাকার পরও তার নামে সরকারি সম্পত্তির দাবি তুলে সাইনবোর্ড টানানো অত্যন্ত রহস্যজনক এবং এটি ইউনিয়ন পরিষদের সিন্ডিকেট করে অনিয়মের করেছেন । তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে পুকুরটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। বৈধ ইজারাদাররা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এদিকে ইজারাদার সৈয়দা নাজনীন আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে আরও বলেন, অবৈধভাবে অর্থ বিনিয়োগ করে একটি প্রভাবশালী চক্র এই পুকুর দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তার দাবি, উপসহকারী প্রকৌশলী আলাউদ্দিনসহ একটি সিন্ডিকেট প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে জাল স্বাক্ষর তৈরি করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে ভুয়া মাপজোক তৈরি করে পুকুরের অংশবিশেষ দখলের চেষ্টা করা হয়েছে এবং সীমানা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে জামালপুর আদালতে একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মামলা চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এক বিবাদী অন্য বিবাদীর কাছে ইজারা দলিল দেওয়াকে তিনি ‘অযৌক্তিক ও অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, সহ-ইজারাদার মোয়াজ্জেম হোসেন দাবি করেন, একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে এই পুকুরের অংশ দখলের চেষ্টা করে আসছে। তার অভিযোগ, প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নানা চাপ ও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসন এই পুকুরসহ কয়েকটি জলাশয় ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে সেগুলো দখল হয়ে যায়। আমি নতুন যোগদানের পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুকুরটি পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব পাই। ওয়াক্ফ ফাউন্ডেশনের জামালপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার অফিসে খোঁজ নিয়ে পুকুরটির কোনো ওয়াক্ফ নথি পাইনি। তাদের কাগজ জাল বলে নিশ্চিত হয়ে আমি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাই। অনুমতি পেয়ে চেয়ারম্যানের নামে সাইনবোর্ড লাগাই। ভুক্তভোগীরা এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। মেহেদী হাসান জামালপুর। ২২-০৪-২০২৬

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow