অনিয়মে জর্জরিত উলিপুরের ৯নং গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদ সেবা বঞ্চিত সাধারণ মানুষ, দায় এড়াচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ৯নং গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সচিব মোছাঃ ববি পারভিনের আইডি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করছেন হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নাজমুল হুদা। ফলে জন্ম নিবন্ধন সহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মূল দায়িত্ব হলো সেবাগ্রহীতাদের সময়মতো জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা প্রদান করা। কিন্তু ইউপি সচিব নিয়মিত অফিসে আসছেন না এবং সেবা কার্যক্রমে অনীহা দেখাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, সচিবের দায়িত্ব কার্যত পালন করছেন সাবেক ইউপি সচিব নুরুন নবী সরকার, যার কোনো বৈধ নিয়োগ বা দায়িত্ব না থাকলেও তিনি নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে নুরুন নবী সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমি সচিব ও সহকারীদের কাজে শুধু হেল্প করি। কাজের বিনিময়ে কোনো সম্মানী বা পারিশ্রমিক পান কি না,এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,ওগুলো কিছু পাই না। কোনো প্রজেক্ট এলে কাজ করি।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, জন্ম সনদ, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স ও উত্তরাধিকার সনদসহ বিভিন্ন সেবায় নির্ধারিত সরকারি ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পরও দিনের পর দিন সেবাগ্রহীতাদের ঘোরানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ইউপি সচিব সপ্তাহে এক বা দুই দিনের বেশি অফিসে আসেন না। দেরিতে আসা, আবার হাজিরা দিয়ে চলে যাওয়া এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার নিত্যদিনের ঘটনা।
সরেজমিনে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি ) ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর ১টা পেরিয়ে গেলেও পরিষদের কোনো কক্ষ খোলা নেই। বহু সেবাগ্রহীতা পরিষদের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। ওই সময় ইউপি সচিব কিংবা হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর কেউই উপস্থিত ছিলেন না।
কিছুক্ষণ পর ইউপি সচিব পরিষদে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আবার চলে যান,নাজমুল হুদা ২০২৬ সালের চলতি'মাসে ও হাজিরা খাতায় নাম ওঠেনি স্বাক্ষর নেই কয়েদিনের।
নিয়মিত অফিসে না আসা, সপ্তাহে দুই-এক দিন উপস্থিত থাকা ও দেরিতে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমার উপজেলায় স্যার আছেন, সেখানে কাজ করে আসতে হয়।
ভুক্তভোগীরা তার কাছে এসে সেবা পাচ্ছেন না এ বিষয়ে তিনি বলেন,সব কাজ হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নাজমুলকে দেওয়া হয়েছে।
নাজমুল কয়েকদিন ধরে অফিসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব বলেন,আমি তাকে ফোন দিয়েছি, কিন্তু নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি।
নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন অনলাইন করে দেওয়া, জন্ম নিবন্ধন করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানোর অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইউপি সচিব কোনো মন্তব্য না করে বলেন,কেউ অবৈধভাবে কোনো কাজ করলে তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে।
সচিব নিজের সরকারি আইডি তার হিসাব সহকারী নাজমুল চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে আইডি ব্যবহারের অভিযোগ ও অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কথা এড়িয়ে যান।
গুনাইগাছ কেবলকৃষ্ণ এলাকার সেবাগ্রহীতা মোছাঃ মেনেকা বেগম অভিযোগ করে বলেন,আমি এক মাস ধরে জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছি। সচিবের কাছে গেলে তিনি বলেন অমুকের কাছে যান, কিন্তু কার কাছে যেতে হবে তার নাম বলেন না। রবিবার এসেও সচিবকে পাইনি। আজ সকাল ১০টায় এসেছি, এখন দুপুর ১টা বাজে,সচিবের কক্ষ তালাবদ্ধ।
একই এলাকার মোঃ শহিদুল রহমান বলেন,দুইটি ওয়ারিশ সনদ নিতে কয়েক দিন ঘুরে নিয়েছি। এখন জমির দলিল করার জন্য আরও একটি দরকার। কয়েকদিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু আজও সনদ পাইনি।
গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা উম্মে সালমা বলেন,পাঁচ দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে আসছি। শুধু বৃহস্পতিবার একদিন সচিবকে পেয়েছি। আমার ছেলে ভোটার হবে, এজন্য ট্যাক্সের রশিদ নিতে এসেছিলাম। পাঁচ দিন ঘোরার পর আজ রশিদ পেয়েছি।
জুম্মার হাট রামধন এলাকার মোছাঃ আনজুনা বেগম বলেন,আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে আসছি। নাজমুলকে ২০০ টাকা দিয়েছি, ১৫ দিন হয়ে গেছে। সব কাগজ জমা দিয়েও কাজ হয়নি। আজ সকাল ১০টা থেকে পরিষদে আছি, এখন ১টা বাজে নাজমুল নেই, সচিবও নেই।
দূরবর্তী মহিদেব এলাকা থেকে আসা শাহিনুর বেগম বলেন,মেয়ের মাদ্রাসায় জমা দেওয়ার জন্য জন্ম নিবন্ধনের কপি দরকার। নাজমুল ৬০০ টাকা দাবি করেন। ৪০০ টাকা দিয়েছি, আরও ২০০ টাকা চাইছেন। ৪–৫ দিন ধরে আসি, কিন্তু কাজ হয় না। আজও সকাল ১০টা থেকে বসে আছি, কেউ আসে নাই।
গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক কেএম মাসুদুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোন কথা হলে তিনি বলেন, সচিব এবং হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেট নাজমুল হুদার অনুপস্থিতির বিষয়ে ইউএনও স্যার সহ ডিসি স্যারকে অবগত করেছি ।
এ বিষয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান বলেন, এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এসবের সত্যতা থাকলে তাকে শোকজ করা হবে।
What's Your Reaction?