আদালত অবমাননার দায়ে সাবেক জেলা জজের দণ্ড

9

ফেনীর সাবেক জেলা জজ মো. ফিরোজ আলমকে আদালত অবমাননার দায়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছে হাইকোর্ট। জরিমানার এই অর্থ ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ না করলে সাত দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে সাবেক এই বিচারককে। ষোলো বছর আগে হাইকোর্টের একজন বিচারক ফেনী সফরে গিয়ে প্রটোকল না পাওয়ায় আদালত একটি রুল জারি করে। সে সময় ফিরোজ আলম ছিলেন ফেনীর জেলা জজের দায়িত্বে। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার ফিরোজ আলমকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন।

পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ভ্রমণ ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রটোকল ব্যবস্থা নিয়ে কয়েকদফা নির্দেশনাও দিয়েছে হাইকোর্ট। এসব নির্দেশনা সার্কুলার আকারে জারি করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আইন সচিবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদালতে ফিরোজ আলমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফয়সাল এইচ খান ও আইনজীবী মইন উদ্দিন টিপু। এ মামলার অপর দুই বিবাদী ফেনী জেলা জজ আদালতের দুই কর্মচারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন ও আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাফি আহমেদ।

রায়ের পর আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী বলেন, হাইকোর্ট আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে ফেনী জেলা জজ আদালতের নাজির ও নায়েবে নাজিরকে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে তত্কালীন জেলা জজ ফিরোজ আলমকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করেছে।

কী ঘটেছিল: ২০০৩ সালের ২০ অক্টোবর হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলামের সফরসূচি জানিয়ে ফেনী জজ আদালতে চিঠি দেয়া হয়। রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো চিঠি পরদিন জজ আদালত গ্রহণ করেন। ২২ অক্টোবর বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ট্রেনে ফেনীতে পৌঁছান। দুপুরে স্টেশনে নেমে জেলা জজ আদালতের কোনো প্রতিনিধি না পেয়ে ফোন করেন। তখন জেলা জজ আদালতের এক কর্মচারী ফোন ধরে বলেন, জেলা জজ এজলাসে আছেন, এজলাস থেকে নামলে বিষয়টি তিনি জেলা জজকে জানাবেন। এর কতক্ষণ পর আবার তিনি ফোন করেন। তখনো বিচারপতি আমিরুল ইসলামের ফোন ধরে আদালতের ওই কর্মচারী একই কথা বলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেল সাড়ে চারটায় বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম তার ছেলেকে জেলা আদালতে পাঠান। কিন্তু সেখানে জেলা জজ বা কোনো কর্মকর্তা তার সঙ্গে কথা বলেননি। পরে জেলা প্রশাসক ওই বিচারপতির প্রটোকলের ব্যবস্থা করেন। সফর শেষে ওই বিচারপতি ঢাকায় ফেরার পর ওই বছরের ২৯ অক্টোবর ফেনীর জেলা জজ মো. ফিরোজ আলমসহ তিনজনের প্রতি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার রুল জারি করে হাইকোর্ট। জেলা জজ ফিরোজ আলম ছাড়া অন্য দুজন হলেন, ফেনী জেলা আদালতের নাজির ইয়ার আহমেদ ও নায়েবে নাজির আলতাফ হোসেন।

আদালত অবমাননার নোটিশ পেয়ে ওই বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টে হাজির হয়ে তিনজনই মৌখিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। হাইকোর্টে তাদের লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা দাখিল করতে বলে ১৭ নভেম্বর আদেশের জন্য রাখে। কিন্তু নির্ধারিত তারিখের আগেই জেলা জজ ফিরোজ আলম আপিল বিভাগে আবেদন করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ ফিরোজ আলমের আবেদনটি খারিজ করে রুল শুনানির আদেশ দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার চূড়ান্ত রুল শুনানি শেষে এ রায় দিলেন হাইকোর্ট।

প্রটোকল নিয়ে নির্দেশনা: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সফরে প্রটোকল দেয়ার বিষয়ে জেলা জজশিপ ও জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদের কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাফি আহমেদ জানান, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কীভাবে প্রটোকল দিতে হবে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে ওই চার দফা নির্দেশনায়। ছুটির দিনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কোনো জেলা সদরে পরিদর্শন, ভ্রমণ বা সফরে গেলে জেলা ও দায়রা জজ পদ মর্যাদার অন্তত একজন বিচারিক কর্মকর্তা সফরকারী বিচারপতিকে সার্কিট হাউস বা তার অবস্থানের জায়গায় অভ্যর্থনা জানাবেন। সে সময় জেলা ও দায়রা জজ জেলা সদর দফতরে অবস্থান করলে অবশ্যই তাকে সফরকারী বিচারপতিকে সৌজন্য কল করতে হবে। সপ্তাহের কোনো কর্মদিবসে অফিস চলাকালে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি সফরে গেলে জাজ ইনচার্জ নেজারত বিচারপতিকে অভ্যর্থনা জানাবেন। তবে আদালতের কার্যক্রম শেষে জেলা দায়রা জজ অথবা তার অনুপস্থিতেতে একজন বিচারিক কর্মকর্তা সফরকারী বিচারপতিকে সৌজন্য কল দেবেন। সফরকারী বিচারপতি উপজেলা বা গ্রামে অবস্থান করলে জাজ ইনচার্জ নেজারত অথবা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তার দেখভাল করবেন।

সফরকারী বিচারপতির বিদায়ের সময় জেলা ও দায়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার বা তাদের প্রতিনিধিদেরও সে সময় উপস্থিত থাকতে হবে।

ভাগ