গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিক্ষোভ, দফায় দফায় সংঘর্ষ

15
বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে গতকালও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে গার্মেন্ট শ্রমিকরা। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। আশুলিয়ার জামগড়া এলাকা থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক মজুরি নিয়ে অসন্তোষ কাটেনি। ঢাকা, গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে চলছে কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ভাঙচুর। সরকারপক্ষ থেকে সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলেও পোশাক শ্রমিকরা রাস্তা ছাড়ছে না। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনা ঘটছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে জানা গেছে এসব তথ্য। চলমান এ সংকট নিরসনে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সংকট সমাধানে গতকাল ত্রিপক্ষীয় কমিটির বৈঠকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রমিক নেতাদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘নতুন মজুরি কাঠামোর বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে চলা শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলকে নাশকতার সুযোগ দেওয়া হবে না। আন্দোলনের নামে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। শ্রমিকদের দাবির বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ কাজ করছে। খুব শিগগির তাদের দাবি মিটিয়ে দেওয়া হবে।’ শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দিয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় ত্রিপক্ষীয় কমিটির অনির্ধারিত বৈঠক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজা খানম, বাণিজ্যসচিব মো. মফিজুল ইসলাম, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী প্রমুখ। শ্রমিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন আমিরুল হক আমিন, মন্টু ঘোষ, নাজমা আকতার, বাবুল আখতার, সিরাজুল ইসলাম রনি, সালাউদ্দিন স্বপন, তৌহিদুর রহমান প্রমুখ।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নতুন মজুরি কাঠামোতে অসংগতি রয়েছে বলে সরকার একমত হয়েছে। এসব বৈষম্য আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে সমাধান করাসহ মূল মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির সব গ্রেডেই বেসিক বা মূল মজুরি বাড়ানো হবে। সে ক্ষেত্রে মোট মজুরি ঠিক রেখেই বেসিক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মজুরি পর্যালোচনা কমিটি। বেসিক বাড়লে বোনাস, ওভারটাইমসহ চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি অর্থ পাবে শ্রমিকরা। গত মাস থেকে কার্যকর হওয়া নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা যে হারে বেড়েছে বেসিক অনুপাতে বাড়েনি। শ্রম অসন্তোষের পেছনে মূল আপত্তি ৩, ৪ ও ৫ নম্বর  গ্রেডের বেসিক ও যৌক্তিক হারে সমন্বয় নিয়ে।

সেটি দ্রুত নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে।

বৈঠক শ্রমিক নেতাদের বলা হয়েছে, ‘সরকার শ্রমিক-মালিক সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করবে। সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিস্থিতি শান্ত রাখা। আপনারা শ্রমিকদের কারখানা ও গাড়ি ভাঙচুর বন্ধ করে কাজে ফিরে যেতে অনুরোধ করুন। তারা কাজে ফিরে না গেলে বাড়ি যেতে বলুন। রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর বা অবরোধ করা যাবে না। আর পরিস্থিতি খারাপ হলে, নাশকতা হলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশের মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে সরকারকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বৈঠক চলাকালীন সরকার ও মালিকপক্ষ আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে সমাধান করার আশ্বাস দেয়। আমরা এই আশ্বাসে আস্থা রাখতে চাই। আমরা শ্রমিকদের অশান্ত না হয়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছি।’

মালিকপক্ষের সদস্য এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘বেসিক সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। কোনো কারখানায় গ্রেড নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে অন্য কারখানায় যাওয়ার সুযোগ আছে। তবে কোনো অবস্থাতেই বিশৃঙ্খলা গ্রহণযোগ্য নয়।’

জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, সব গ্রেডেই বেসিক বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে কমিটি। কাজে ফিরতে শ্রমিকদের আবারও অনুরোধ করেছে কমিটি। শ্রমিকরা যদি কাজ করতে না চায়, তাহলে রাস্তায় নেমে যেন বিশৃঙ্খলা না করে এ বিষয়ে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। গেজেট অনুযায়ী, গত মাস থেকে নতুন কাঠামোর মজুরি কার্যকর করেছে মালিকপক্ষ। গত সপ্তাহে নতুন মজুরি হাতে পেয়ে শ্রমিকরা নানা বৈষম্য ও অসন্তোষের কথা জানিয়ে আন্দোলনে নামে। এ অবস্থায় গত পাঁচ দিন বিভিন্ন স্থানে গার্মেন্টকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১৪, টোলারবাগ, বাঙলা কলেজের সামনে ও টেকনিক্যাল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে গার্মেন্টকর্মীরা। এ সময় পুরো এলাকায় তীব্র যানজট দেখা যায়। গাবতলীর কাছে টেকনিক্যাল মোড়ে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিলে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী তাদের সরিয়ে দেয়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে সেখানে গাড়ি চলাচল ফের শুরু হয়। এর আগে সকাল ১১টার দিকে শেওড়াপাড়ার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও সড়কে নেমে আসে। তাদের অবস্থানের কারণে রোকেয়া সরণিতে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি মোটরসাইকেল ও একটি প্রাইভেট কার ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।

আশুলিয়ায় গতকাল অন্তত ৩৫টি কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। তারা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কে অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করেছে। শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে যাত্রীসহ ১০ জন আহত হয়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সাভারের উলাইল এলাকায়ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করে আন্দোলনরত শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশ তাদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।

গাজীপুরে বিভিন্ন স্থানে গার্মেন্ট শ্রমিকরা গতকাল বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে। টঙ্গীতে আন্দোলনরত পাঁচ শ্রমিককে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার খবরে গার্মেন্ট ও গাড়ি ভাঙচুর এবং মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। কয়েক স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়াধাওয়ি হয়েছে। টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলে অনেকটা অচালবস্থা তৈরি হয়।

গাজীপুর মহানগর ও জেলার কোনাবাড়ী, টঙ্গী, গাজীপুরা, ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা, ইসলামপুর, সাইনবোর্ড, বোর্ডবাজার, নলজানী এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গার্মেন্ট শ্রমিকরা গতকাল সকাল থেকে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে। তারা কয়েকটি গার্মেন্টে ইটপাটকেল ছুড়ে ভাঙচুর করে। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের নাওজোড়, কোনাবাড়ী, বোর্ডবাজার ও গাজীপুরা এলাকায় সড়ক অবরোধসহ গাড়ি ভাঙচুর শুরু করলে মহাসড়কগুলোর কয়েক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মহাসড়কের ওপর থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সঙ্গে শিল্প পুলিশ, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় অর্ধশত গার্মেন্টে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ভাগ