একজন শিক্ষক এর চলে যাওয়া…সাবিনা ইয়াসমিন

314

জামালপুর প্রতিনিধি ঃ শিক্ষক সমাজ সংগঠক, জাতি গঠনের কারিগর। আমার স্কুল শিক্ষক হাতেম আলী স্যার। শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত পড়াতেন। সাবলীল সহজ সরল মানুষ, বাড়ী গেলে প্রায়ই স্যারের সাথে দেখা হতো। সমাজের নানা অসঙ্গতি যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর তা তিনি মানতে পারতেন না। সেই সব বিষয় নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে আমার সাথে কথা বলতেন।
গতকাল স্যার আমাদের কাছ থেকে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তেমন অসুস্থ ছিলেন না। আজ স্যারকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করছি।
আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে আমাকে একদিন ফোন করলেন। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে, আমি জিজ্ঞাসা করতেই সমস্ত বাঁধ ভেঙ্গে যেন কেঁদেই ফেললেন, বললেন – দেখো ইয়াসমিন, মানুষ তার কর্মক্ষেত্রে শেষ জায়গাটা লক্ষ্য করে আপন মনে পরিশ্রম করে, বছরের পর বছর শ্রম দেয়। চাকুরী জীবনে আমার আর মাত্র ২ বছর সময় আছে, সকল শিক্ষকদের মধ্যে আমি সিনিয়র। কতিপয় লোকজন বাহিরের স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষক আনতে চাচ্ছে। তুমি একটু আমার জন্য চেষ্টা করলে আমার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ হয়। মরার আগে শান্তি পেয়ে মরতে পারবো। আর যদি অন্য স্কুল থেকে কাউকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, অপমানে, লজ্জায় আমার বাকি জীবন পার করতে হবে।

আমি একজন শিক্ষকের আবেগকে সেদিন নিজ মনে অনুভব করেছিলাম এবং আমি আমার সবটুকু অনুরোধ আকুতি দিয়ে মাদারগঞ্জের গর্বিত মায়ের গর্বিত সন্তান জনাব মির্জা আজম ভাইকে আমার স্যারের ন্যায্য আবেদনটি পৌঁছে দিয়েছিলাম।

কয়েকদিন পর আবারও ফোন আসলো, এবারও কান্না , নিরাশ মনে জিজ্ঞাসা করলাম আমি, কি হলো স্যার, আপনার প্রধান শিক্ষক হওয়া হয়নি? স্যারের উত্তর, হ্যাঁ, এ কান্না খুশির, আমি প্রধান শিক্ষক হয়েছি, আমার এত বছরের পরিশ্রম এবার স্বার্থক হলো।

আমাকে বললেন, একজন শিক্ষকের মূল স্বার্থকতা তার ছাত্ররা যদি মানুষের মতো মানুষ হয়। আমি দোয়া করি, তুমি আরও বড় হও।

আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই জনাব মির্জা আজম ভাইকে যিনি স্যারের যোগ্য সম্মানটুকু দিয়েছেন।

পর্ব ২: প্রায় ফোনে কথা হতো, কবে বাড়ী যাবো অপেক্ষায় আছেন তিনি। অনেক কথা সাক্ষাতে বলবেন বলে অপেক্ষায় আছেন।
গত শীতে বাড়ী গেলাম, লোক মুখে শুনে শীতের কনকনে ভোরে বাড়ীতে এসে হাজির, প্ল্যান শেয়ার করলেন। সমাজের অনেকের সাথে কথা বলেছেন তিনি। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা ধায্য করেছেন। আমার ভাগে আধা বিঘা জমি ধায্য করেছেন বললেন, যারা ভূমিহীন, বসতভিটা ছাড়া আর কোন জমি নেই সেই সব লোকদের মৃত্যুর পর কবর দেয়ার জায়গা এবং পাশে ঈদগা মাঠ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তিন একর জায়গা প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে, সেদিন স্যারকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকার চেক দিয়ে বলেছিলাম, আপাতত এই টাকাটা রাখেন স্যার বাকিটা পরে দেখবো।
কিন্তু আমি রয়ে গেলাম, স্যার আজ নেই, সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে কেউ কি আর মাথা ঘামাবে ???

সাবিনা ইয়াসমিন
সদস্য, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় কমিটি।
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জামালপুর জেলা শাখা।

মেহেদী হাসান
জামালপুর প্রতিনিধি

ভাগ