খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রসঙ্গ

8

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস ও পুষ্টি সাধনের ওপর একটি দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে। খাদ্য নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, নির্মল বায়ু, পরিবেশ সক্ষমতার ভিত্তিতেই একটি দেশের উন্নয়নের রোল মডেল রচিত হয়। পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিক রোগাক্রান্ত দুর্বল, অক্ষম, অকর্মণ্য, বেকার জনসংখ্যার আধিক্ষ্য একটি দেশের জন্য আশীর্বাদের বিপরীতে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই সুস্থ সবল মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে ততই সে জাতি সমৃদ্ধ সভ্যতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য-পানীয় ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সুরক্ষার বিষয়গুলো অতি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যে খাদ্য আমাদের জীবন বাঁচায় সে খাদ্য যদি কৃত্রিম উপায়ে অখাদ্যে রুপান্তরিত হয়, তাহলে সেসব খাদ্য গ্রহণের শেষ পরিণতি হলো জীবন অবসান। যে খাদ্য আমাদের ক্ষুধা নিবারণ, পুষ্টি সাধন ও বল বাড়ানোর জন্য খাই সেই খাদ্য যদি মরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবেই ঘটে নানা ভোগান্তি ও বিপত্তি। খাদ্যের উদ্দেশ্যই হলো শরীরকে সুস্থ রাখা, পুষ্টিমান নিশ্চিত করা, রোগ প্রতিরোধ করা, আয়ু বৃদ্ধি করা সর্বপরি ক্ষুধা ও দারিদ্রতা দূর করা। এমন নিরাপদ খাদ্যকে মুনাফা খোরদের কারণে পরিকল্পিত ভাবে কেমিক্যাল মিশ্রিত করে অখাদ্যে পরিণত করা এখন ওপেন সিকরেট। খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সুখাদ্য কুখাদ্যে রুপান্তরিত করা ও ওষুধ তৈরিতে গুণগত মানের হেরফের করা কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না।

ইদানিং পত্র পত্রিকা বা মিডিয়াতে খাদ্যে ও ওষুধপত্রে ভেজালের লোমহর্ষক আতঙ্কিত খবরাখবর আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে আমি আপনি যা খাচ্ছি তা কি নিরাপদ না অনিষ্ঠকর। অনিরাপদ খাদ্যের কারণে নানা রকম দূরারোগ্য ব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফলে বড় বড় রোগে আক্রান্ত হয় কোটি কোটি বনি আদম। ব্যাহত হয় সুস্থ সবল সভ্য সমাজ ব্যবস্থা।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৭ সালে চরম অপুষ্টির শিকার ছিলেন ৮২ কোটি ১৫ লাখ মানুষ। যা মোট জনসংখ্যার ৯ জনের ১ জন। এ ছাড়া ৫ বছরের কম বয়সের ২২ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশুর বৃদ্ধি অপুষ্টির কারণে ব্যহত হয়েছে এই সময়ে। এ ছাড়া বর্তমানে বিশ^ব্যাপী সুষম ও নিরাপদ খাবারের অভাবে যা-তা খেয়ে স্থুলকার শিকার হয়েছেন ৬৭ কোটি ২০ লাখ পূর্ণ বয়স্ক মানুষ। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সংস্থাগুলো জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ফলে সুস্থ সবল সমৃদ্ধ জাতি গঠন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

বিশে^ মানসিক রোগীর সংখ্যা ৪০ কোটি, তন্মধ্যে বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি। এ ছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে মানসিক প্রতিবন্ধী ১ কোটি ২০ লাখ, মাদকাসক্ত ৩৫ লাখ, এইডস রোগী ৩০ হাজার, থেলাসেমিয়া ৪ লাখ, স্তন ক্যান্সার ১৩ হাজার, জরায়ুর ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার, অটিস্টিক ৭০ হাজার। ৩ কোটি বেকার যুবক মানসিক চাপে আক্রান্ত হয়ে নানা রকম দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছেন।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২৩ সালের মধ্যে পৃথিবীর আরও ১০০ কোটি মানুষকে অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে চিকিৎসাসেবার ব্যয় বহন করতে গিয়ে বছরে প্রায় ১০ কোটি মানুষ অতি দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ বিগ্রহ, নিরাপদ খাদ্য সংকট, অপুষ্টি, রোগবালাই ও নির্মল বায়ুর অভাব। এ ছাড়া খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় আরও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে যা সচরাচর আলোচিত হয়না। নি¤েœ এসব উপেক্ষিত বিষয় সমূহ নিয়ে আলোচনা করে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করা অত্যবশ্যক বলে মনে করি।

দেশের শহর নগরে, গ্রামেগঞ্জে, নিত্যরাতে ব্যবহৃত বৈধ ও অবৈধ কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়া, শিল্প কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং ইটের ভাটার কালো ধোঁয়া অক্সিজেনের সাথে মিশে শ^াসকষ্ট হৃদরোগসহ মানবদেহে নানারকম জটিল ও কঠিন রোগের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। সেইসাথে শব্দ দূষণ, রাস্তাঘাটের ধুলাবালি, কল কারখানার বর্জে পুকুর নদ-নদীর পানি দূষণসহ ইন্টারনেট টাওয়ার এর কুপ্রভাবে জনস্বাস্থ্য ও মেধার মারাত্মক ক্ষতি করছে প্রতিনিয়ত।

গণসৌচাগার, রোগবালাই ছড়াবার কারখানা। যেমন- রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর, কমিউনিটি সেন্টার, বিনোদন কেন্দ্র, চিড়িয়াখানা, স্টেডিয়াম, অডিটোরিয়াম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিপণী বিতান, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত, জেলখানা, হাসপাতাল, হোটেল রেস্তোরা, ব্যাংক-বীমা, এনজিও অফিস, বাস-কোচ কাউন্টার, সেনা-নৌ-বিমান-আনসার-ভিডিপি ও পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ব্যারাক সমূহে এবং স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ^বিদ্যালয়, মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয় সমূহসহ সিনেমাহল, পাবলিকহল, সার্কিটহাউজ, আবাসিক হোটেল, আশ্রয়ন কেন্দ্র, নির্বাসন কেন্দ্র, নিষিদ্ধ এলাকাসহ উপরোক্ত জনবহুল স্থানসমূহে গণসৌচাগারে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা সর্বোপরি হাত ধোয়ার সুবন্দবস্ত কাক্সিক্ষত মানের নেই। এতে হাত ধোয়ার অভাবে এসব এলাকার সৌচাগার, গোসলখানা, ওজুখানা, পানির ট্যাপ, সিটকেরি ও হাতলের মাধ্যমে সরাসরি হাতে হাতে রোগজীবাণু বহনের মাধ্যমে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মানবদেহ থেকে দেহে। এতে অগণিত রোগজীবাণুর হাত থেকে খাদ্যে, খাদ্য থেকে মুখে, মুখ থেকে পেটে পৌঁছে গিয়ে কৃমিসহ নানা ধরনের রোগ সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে।

মশা, মাছি ও নানা রকম কীটপতঙ্গের মাধ্যমে অতি দ্রুত নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় ফলমূল সহজেই জীবাণুযুক্ত হয়ে সুখাদ্য কুখাদ্যে রুপান্তরিত হচ্ছে। ফলে সেসব দূষিত খাবার খেয়ে অনেকেরই আমাশয়, ডায়রিয়াসহ নানা রকম পেটের পীড়ার পাশাপাশি অনেক রোগের প্রাদূর্ভাব দেখা দিচ্ছে।

খাবারের আগে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস আজ বেশি প্রয়োজন। হাতের জীবাণুগুলো যত দ্রুত রোগ ছড়ায়, অন্য কোনো উপায়ে তা ছড়াতে পারে না। এজন্য পায়খানার পর খাবারের পূর্বে হাত ধোয়ার অভ্যাস যে কত জরুরি তা বলাই বাহুল্য।

সেলুনের মোটা তয়লা, পাতলা কাপড়, ব্লেড, চিরুনীর মাধ্যমেও জটিল ও কঠিন জীবাণু আক্রমণ করে। খৌরকার্য করার বদলে ব্লেড দিয়ে চুল, দাঁড়ি, গোফ কামাতে একই ব্লেড দিয়ে, একই চিড়–নী দিয়ে, একই তয়লা দিয়ে দিনরাত ভিন্ন ভিন্ন মানুষের নরসুন্দরের কাজ করতে গিয়ে অজান্তেই এইচআইভি অথবা এইডস রোগের জীবাণু ঢুকে যেতে পারে দেহের মধ্যে। যে রোগ নিরাময় ও নির্ণয় সম্ভব নাও হতে পারে। অনেকেই সেলুনের পুরনো ব্লেড দিয়ে নিজেদের হাত-পায়ের আঙ্গুলের নখ কেটে থাকেন। এতেও কেটে গিয়ে এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। যে রোগের শেষ পরিণাম মৃত্যু। আমাদের ছোট ছোট শিশুদের চুল কাটার জন্য সেলুনে নিয়ে গিয়ে তাদের খৌরকর্মের সময় অন্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ব্লেড নাপিত ব্যবহার করছে কিনা তাও খেয়াল করিনা। এতেও এ ধরনের রোগবালাই ছড়াতে পারে। এজন্য ব্লেড কিনে নিয়ে নাপিতের নিকট ধরিয়ে দিয়ে নরসুন্দরের কার্য সম্পাদন করলে নিরাপদে থাকা অনেকটা সহজ হয়।

অন্যের ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছেদ, বিছানাপত্র, খৌরকর্ম ও দাঁতের ব্রাশ এর যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা স্বাস্থ্যসম্মত। এতে কৃমিসহ যাবতীয় চর্ম ও ছত্রাক রোগের সংক্রামক থেকে বাঁচা যায়। বাড়িতে একই ব্রাশদানীতে গাদাগাদি করে টুথব্রাশ রাখার প্রবণতা অনেক পরিবারেই লক্ষ্য করা যায়। এতে টুথব্রাশের জীবাণুর মাধ্যমে অসুস্থ মানুষের মুখের জীবাণু সুস্থ মানুষের মুখে প্রবেশের মাধ্যমে নানারকম সংক্রামক রোগের আক্রমণ ঘটতে পারে।

মলমূত্র ত্যাগের পর সাবান টিস্যু ব্যবহার না করে সৌচকর্ম সম্পাদনের পর সেই হাত দিয়ে বদনা, মগ, পানির ট্যাপ, বাথরুমের হাতল, সিটকেরি, ব্যবহারের অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে, অনেকেই এ অবস্থায় অযু করে মসজিদে গিয়ে নামাজের সিজদার সময় সিজদার স্থানে হাত রাখায় সেখান থেকে নামাজিদের নাক মুখের মাধ্যমে দ্রুত জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবশ্য স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা এসব স্থানে অবস্থানকালে সরাসরি হাত ব্যবহার না করে টিস্যু দ্বারা আবৃত করে ব্যবহার করতে পারেন।

ধুমপানে অসংখ্য রোগবালাই আক্রমণ করে। ধুমপান মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এতে ধুমপায়ীসহ আশেপাশের অধুমাপায়ীদেরও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। অনেকেই জনবহুল এলাকায় ধুমপান করেন, এমনকি শিশুদের কোলে নিয়ে ধুমপানের অভ্যাস অনেকেরই মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এ বদঅভ্যাস যেমন নিজের ক্ষতি করে তেমনি নিজের পরিবারের সদস্যদেরসহ জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।

পানের দোকানের তামাক জর্দ্দার মাধ্যমে স্বাস্থ্যহানীর মতো মারাত্মক রোগ ছড়ায়। কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল তামাক জর্দ্দার বিষয়টি আরও মারাত্মক। যিনি পান তৈরি করেন তাঁর হাতে নিরাপদের অভাব। পানের দোকানদারের হাঁচি, কাশি, নাক চুলকানো, দাঁত খিলাল করা অবস্থায় পান পরিবেশন করায় সহজেই পানের মাধ্যমে নানারকম রোগ ছড়াতে পারে।

চায়ের দোকানের মাধ্যমে রোগ ছড়াতে পারে। বিশেষ করে বাসি লালচে তরল দুধের মাধ্যমে, দুধের কৌটা ও চিনির কৌটায় মাছি পড়ার মাধ্যমে চায়ের কাপে রোগ ছড়াতে পারে। তাছাড়া যিনি চা তৈরি করেন তাঁর খাদ্য সামগ্রী, হাত ও বাসনের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

খোলা বাজারে নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার ও পানীয় মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এ সব খাদ্য পানীয় তৈরিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ফরমালিন এবং ক্ষতিকর রং মেশানোর প্রবণতা খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এসব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আমরা জানি টিউবওয়েলের পানি আর্সেনিক না থাকলে নিরাপদ। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে বা অন্য কোনো সময়ে অনেকেই পায়খানা থেকে ফিরে হাত না ধুয়েই প্রথমেই বাম হাত দিয়ে টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল বা পানির ট্যাপ খুলে চেপে ধরে খালি বদনায় পানি ভরিয়ে হাত ধুয়ে চলে যান। এরপর যিনি আসেন তিনিও এরকম করে থাকেন। এরপর গৃহস্থলী কাজকর্ম সম্পাদনের জন্য মহিলারা টিউবওয়েলের মুখের নিচে হাড়ি বাসন বসিয়ে দুই হাত দিয়ে নলকূপের হাতল ধরে চাপতে চাপতে পানি ভরতে থাকেন। এক পর্যায়ে কলস ভরে গেলেও উপচে পড়ার জন্য কয়েক চাপ পানি ভরেন এবং ডান হাত দিয়ে কলসের মুখের দুই চোল পানি ফেলে দেবার প্রবণতা যথেষ্ট লক্ষ্য করা যায়। এতে করে হ্যান্ডেলের গায়ে লেগে থাকা পায়খানার জীবাণুগুলো হাতের মাধ্যমে সহজেই কলসির পানিতে মিশে যায়। এই কলসির পানি নিরাপদ মনে করে যারা পান করেন তাঁদের নানা রকম রোগবালাই দেখা দেয়, কিন্তু কি কারণে এ রোগ হয়েছে তা বুঝতে পারেন না।

মূলত খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানা দিক এখনও অনেকের অজানা। এসব বিষয়ে গণসচেতনতা ও সাবধানতা অতীব জরুরি বিষয়। রোগ হওয়ার আগে রোগ প্রতিরোধ করার বিষয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সাবধানতা অতীব জরুরি। এক্ষেত্রে সমাজের কিয়দংশ মানুষ সচেতন হলে হবেনা, এতে করে কোনভাবেই সচেতন মানুষগুলোও স্বাস্থ্য নিরাপদে থাকতে পারে না, এজন্য সকলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গণসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ অতীব জরুরি। বিশেষ করে বৃক্ষরোপন, জীব ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পুকুর ও নদ-নদী রক্ষার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির যাবতীয় পরিবেশ রক্ষায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা দরকার।

নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য নেটওয়ার্ক (BFSN) ২০১০ সালে গঠিত হয়। শুরুতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এর সহায়তায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ও নেদারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহায়তায় এই নেটওয়ার্ক গঠিত হয়। এর সাথে যুক্ত আছে দেশের পরিবেশ, খাদ্য ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অধিদপ্তর। যেমন স্বাস্থ্যশিক্ষা বূরে‌্যা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ওয়ার্ল্ড হেল্থ ওরগানাইজেশন, ফুড এন্ড এগ্রিকালচার ওরগানাইজেশন অফ দ্যা ইউনাইটেড ন্যাশনস। এছাড়া উবিনীগ, বি-সেফ, শিসুক ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডসহ অন্যান্য দেশি বিদেশি সংস্থা বা সংগঠন এ বিষয়ে কাজ করছে।

সম্প্রতি বিশ^ হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে বগুড়ায় জেলা সদরে এক সেমিনারে বাংলাদেশ ফুড সেফটি নেটওয়ার্কের অন্যতম সদস্য সংগঠন “হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড” এর কান্ট্রি ডিরেক্টর বগুড়ার সন্তান বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক আতাউর রহমান মিটন এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জানতে পারি, বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে যথেষ্ঠ অগ্রগতি লাভ করেছে, কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও প্রশ্নবোধক। মানুষ নিরাপদ খাদ্য খেতে চায় কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা কোথায়? উক্ত কর্মশালায় গিয়ে নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলে সুস্থ থাকার উপায় বিষয়ক স্টিকারে কয়েকটি বার্তা জানতে পারি, যেমন- সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করি-রোগ জীবাণুমুক্ত জীবন গড়ি। খাবার তৈরি ও পরিবেশনে-হাত ধুয়ে নেব সযতনে। সুস্থ থাকার প্রথম ধাপ- সাবান দিয়ে ধোব হাত। যতবার পায়খানায় যাই-সাবান দিয়ে হাত ধোয়া চাই। ঘরে, বাইরে যেখানেই খাই-খাওয়ার আগে হাত ধোয়া চাই। ময়লা-আবর্জনা আর পশু-পাখি ধরার পরে- হাত ধুয়ে নেব সকলে। পঁচা-বাসি খাবার খেলে-অসুখ হবে সবাই বলে। সুস্থ দেহ যদি চাই-টাটকা খাবার সদাই খাই। খোলা খাবারে জীবাণু তাই-খাবার ঢেকে রাখা চাই। টিউবওয়েল আর ফুটানো পানি-নিরাপদ হয় সবাই জানি। ফলমূল, শাকসবজি যদি কাঁচা খাও-নিরাপদ পানি দিয়ে তা ধুয়ে নাও।

মোটকথা শিক্ষা, অর্থনীতি, নিরাপদ খাবার ও উপযুক্ত পরিবেশ যেকোনো উন্নয়নের উপাত্ত বৃদ্ধি করে, এগুলো এড়িয়ে টেকসই উন্নয়ন SDG অর্জন আদৌ সম্ভব নয়। কাজেই সময় থাকতে সুস্থ সবল সমৃদ্ধ দেশ ও জাতি গঠনে পরিস্থিতির আলোকে যা যা করণীয় তা করতে কালক্ষেপণ করা মানেই উন্নত দেশের মর্যাদা লাভে হেয়ালীপনা। বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, পাশাপাশি জনসংখ্যাও তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু খাদ্যের গুণগত পুষ্টিমান ও খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে অভিযান চললেও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমেই তা থেমে যায়।

প্রাণীজগতে নিরাপদ পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে একটি দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি-রপ্তানি, মজুদ, সরবরাহ ও বিপণন বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ সালে প্রণীত আইনের যথার্থ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা হলে সুস্থ সবল সমৃদ্ধ জাতি গঠনের সফলতা ও চেতনার মাত্রা অসাধারণভাবে সফল হতে পারে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রের কর্ণধারদের এগিয়ে আসার বিকল্প নেই বলে অভিজ্ঞ মহল ও ভুক্তভোগী মহলের ধারণা।

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

ভাগ