সাত বছর পরও অপেক্ষা

14

• তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
• সাত বছর আগের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি
• যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত বাসচালকের আপিল হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায়
• ক্ষতিপূরণ চেয়ে পৃথক দুই মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি
• মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন কর্মসূচি

সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের নিহত হওয়ার ঘটনায় সাত বছর আগে করা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বাসচালকের আপিল এখন হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

এ ছাড়া নিহত দুই পরিবারের পক্ষ থেকে মোটরযান অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে ক্ষতিপূরণ চেয়ে পৃথক দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে তারেক মাসুদের পরিবারের করা মামলায় হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণ দিতে রায় দিয়েছেন। এই রায়ের পর বাসমালিকপক্ষ ও বাদীপক্ষ পৃথক লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছে, যা আপিল বিভাগে শুনানির জন্য রয়েছে। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের পক্ষ থেকে করা ক্ষতিপূরণ মামলা হাইকোর্টে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে।

সাত বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে তাঁরা দুজনসহ মাইক্রোবাসের পাঁচ আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় ২০১১ সালে পুলিশ বাদী হয়ে ঘিওর থানায় মামলা করে। বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এক রায়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন।

ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা দুটি মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে দুই পরিবারের অন্যতম আইনজীবী বিলকিস আক্তার গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, তারেক মাসুদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ মামলায় হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে বাসমালিকপক্ষ এবং বাদীপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল শুনানির জন্য ৮ অক্টোবর আপিল বিভাগে দিন ধার্য রয়েছে। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের করা ক্ষতিপূরণ মামলাটি বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে। সোমবার (আজ) এই মামলায় শুনানি হতে পারে।

বাসচালকের আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা গত বছরই হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে জরিমানার আদেশ স্থগিত করেছেন। আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। বাসচালক এখন কারাগারে আছেন।

আদালত সূত্র জানায়, ওই দুর্ঘটনার পর ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের পরিবারের মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাসমালিক, চালক এবং ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে পৃথক দুটি মামলা করে। পরে সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে মামলা দুটি নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে বদলির নির্দেশনা চেয়ে বাদীরা আবেদন করেন। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ এবং মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলি কাজী ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর হাইকোর্টে ওই দুটি আবেদন করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর উচ্চ আদালত এক রায়ে মানিকগঞ্জ জেলা ও মোটর ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালে করা মামলা দুটি হাইকোর্টে বদলির আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে ওই মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য পাঠান প্রধান বিচারপতি। হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ শুনানি শেষে তারেক মাসুদের পরিবারের করা ক্ষতিপূরণ মামলায় গত বছরের ৩ ডিসেম্বর রায় দেন। রায়ে তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়।

রায়ে বলা হয়, ওই অর্থের মধ্যে বাসের দুই অপারেটর ও এক মালিক যৌথভাবে ৪ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫২ টাকা দেবেন। রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড দেবে ৮০ হাজার টাকা। আর বাস (চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স) চালক দেবেন ৩০ লাখ টাকা। মোট অর্থের মধ্যে ১০ লাখ টাকা তারেকের মা নুরুন নাহার এবং বাকি অর্থ তারেকের স্ত্রী ও ছেলেকে দিতে বলা হয়েছে। বিবাদীপক্ষকে ছয় মাসের মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।

বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবেন এই আশা করেন মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলি কাজী। গতকাল রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফৌজদারি মামলায় পাঁচ বছরের মাথায় বিচারিক আদালতের রায় পেয়েছি। তবে এখনো উচ্চ আদালতে মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি, এ জন্য হতাশ। ক্ষতিপূরণ মামলা লড়ছি। আশা করি ন্যায়বিচার পাব।’

মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন কর্মসূচি
তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর স্মরণে আজ বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে তারেক মাসুদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ১০টায় ভাঙ্গা পৌরসভায় নূরপুর গ্রামে তারেক মাসুদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ। বেলা ৩টায় ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের কাজী মাহবুব উল্লাহ হলে তারেক মাসুদের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ভাঙ্গা সরকারি কে এম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোসায়েদ হোসেন জানান, আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন তারেক মাসুদের মা নুরুন নাহার মাসুদ। সভায় গুণীজনদের সম্মাননা জানানো হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা ও রচনা প্রতিয়োগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

ভাগ