দেশজুড়ে দেশি গরুর খামার চাহিদাও বেশি মজুদও পর্যাপ্ত

22

আর মাত্র ৫ দিন বাকি ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের। সরকারি হিসাবে গবাদি পশুর পর্যাপ্ত জোগান থাকলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব গরুর হাটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে কর্তৃপক্ষের মধ্যেই। এ ছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এবারও আশঙ্কা করা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু হাটে ওঠার। মেয়াদোত্তীর্ণ টিটেনাস ইনজেকশন বিক্রিয়া ঘটিয়ে গরুকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহারের ঘটনা ধরা পড়ার পর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ গবাদি পশু (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ)। গত বছর কোরবানির ঈদে ব্যবহৃত হয়েছিল এক লাখ চার হাজার পশু। সেই তুলনায় এবার উদ্বৃত্ত রয়েছে ১২ লাখ পশু। এ ছাড়া বরাবরের মতো এবারও বৈধ প্রক্রিয়ায় বাইরে থেকে কিছুসংখ্যক গবাদি পশু আমদানির বিষয়টিও হিসাবে রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এর পরও এবার বাড়তি একটি চাপ পড়তে পারে কোরবানির পশুর হাটে। কারণ সামনে নির্বাচন। সারা দেশের সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে বাড়তি সংখ্যায় গবাদি পশু কোরবানি দিতে পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গবাদি পশুর জোগান যেহেতু উদ্বৃত্ত আছে সেহেতু কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে এবার বাড়তি একটা চাপ পড়তে পারে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। আমাদের ধারণা, কমপক্ষে পাঁচ লাখ গবাদি পশু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়তে পারে। এলাকায় এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের উদ্যোগে সাধারণ মানুষের জন্য এসব গবাদি পশু কোরবানি করা হতে পারে। তাই আমরা সেদিকে নজর রাখছি। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে অবৈধভাবে একটি পশুও আসার সুযোগ নেই। তবে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বর্ডার ক্যাম্পে ট্যাক্স দিয়ে কেউ যদি কোনো গবাদি পশু নিয়ে আসে সেটাকে অবৈধ বলা যাবে না। যদিও এমন সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

এদিকে গবাদি পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও দামের ক্ষেত্রে এবার এক ধরনের নৈরাজ্যের আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট অনেকে। বিশেষ করে মধ্যম ও বড় আকারের গরু ও খাসির ক্ষেত্রে বিক্রেতারা তাদের ইচ্ছা অনুসারে দাম হাঁকাতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত ছোট গরুর ক্ষেত্রে দাম স্বাভাবিক বা ক্ষেত্রবিশেষে কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ বিষয়ে বলেন, ‘দামের বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। কোরবানি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। তাই হয়তো বিক্রেতারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।’

এদিকে বিভিন্ন এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জব্দ করেছে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গরু মোটাতাজা করার নানা ধরনের বিষাক্ত ওষুধ। কোথাও কোথাও নতুন ধরনের অপকৌশলও ধরা পড়েছে।

জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবারই কোরবানির ঈদের আগে গরু মোটাতাজাকরণের নানা ধরনের বিষাক্ত ওষুধের তৎপরতা থাকে। এবারও তা আছে। গত ১ আগস্ট আমরা ঢাকার মিটফোর্ডে অভিযান চালিয়ে মানুষের বিভিন্ন ওষুধের পাশাপাশি গরু মোটাতাজাকরণের বিপুল পরিমাণ অবৈধ ওষুধ জব্দ করেছি। সারা দেশেই হয়তো এমন ওষুধ রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই মনিটরিং বাড়ানো খুব জরুরি।’

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম আরো বলেন, ‘এবার নতুন পদ্ধতি দেখে খুবই শঙ্কিত হয়েছি। সেটা হচ্ছে মানুষের শরীরে সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ব্যবহৃত টিটেনাস ইনজেকশন ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়াদ পার করে ওই ওষুধে এক ধরনের বিক্রিয়া ঘটিয়ে তা গরুতে প্রয়োগের মাধ্যমে মোটাতাজাকরণের জন্য ব্যবহার করার তথ্য পেয়েছি। এমন গরু মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সবাইকে গরু কেনার সময় সতর্ক থাকতে হবে। কোন গরু স্বাভাবিকভাবে, কোনটি অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা হয়েছে ক্রেতাদের তা বোঝা উচিত। তিনি বলেন, ‘সারা দেশেই প্রতিটি গরুর হাটে আমাদের মেডিক্যাল টিম ও মনিটরিং টিম দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকায় ২৩টি গরুর হাটে মোট ২৭টি মেডিক্যাল টিম থাকবে। এসব ক্ষেত্রে গবাদি পশুর রক্ত পরীক্ষারও ব্যবস্থা থাকবে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, মেডিক্যাল টিম গবাদি পশু সুস্থ-সবল রাখার জন্য কাজ করবে, আবার কোনো গবাদি পশু অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড বা অন্য কোনো রাসায়নিক প্রয়োগের ওপরও নজর রাখবে। তিনি বলেন, ‘এমন কোনো পশু যাতে হাটে না ঢুকতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় এ জন্য অভিযানও চালানো হবে। ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে দোষীদের। প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই সারা দেশেই এ ব্যাপারে সতর্ক নজর রাখার জন্য বলা হয়েছে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের।’

নিরাপদ গরু কিভাবে চেনা যাবে তা জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত অস্বাভাবিক মোটাতাজা গরু অস্বাভাবিক স্থূল দেখায়, নিচের অংশে পানি জমে থাকে, থলথলে অবস্থা থাকে, মাংসল স্থানে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে আঙুল দেবে থাকে, চোখে নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো ঝিমুনির ভাব থাকে, চঞ্চলতা থাকে না, গতিবিধি থাকে নিস্তেজ ধরনের। রোদে থাকতে পারে না, ঘন ঘন পানি খায় এবং ঘন ঘন প্রস্রাব করে। এসব গবাদি পশুর কিডনি ও লিভার বিকল হয়ে যায়। অসময়ে এসব গরু মারা যায়।

নতুন পদ্ধতিতে অসাধু চক্র গরু মোটাতাজা করতে টিটেনাস ব্যবহারের বিষয়ে ড. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘এমন কোনো তথ্য এখনো আমার নজরে আসেনি। তবে টিটেনাস যেহেতু সিরাম বা প্রোটিনজাতীয় উপাদান তাই অসাধু চক্র এটির অপপ্রয়োগ ঘটাতে পারে, যা গবাদি পশু ও মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক।’

ভাগ