কমিটির মেয়াদ শেষ হবার আগে গণহারে পদ দিচ্ছে ছাত্রলীগ

321
* কমিটির মেয়াদ ​আছে দেড় মাস * শেষ সময়ে নতুন পদ দেওয়া হয় ১৬২ জনকে * এখন কমিটির মোট সদস্যসংখ্যা কত, বলতে পারেননি নেতারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের ‘গঠনতান্ত্রিক মেয়াদের’ শেষ সময়ে এসে কোনো তালিকা ছাড়াই গণহারে পদ দেওয়া হচ্ছে। গত ২০ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন করে পদ দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৬২ জনকে। এর আগেও দুই দফায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে আওয়ামী লীগের গত কেন্দ্রীয় কমিটিতে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে গণহারে সহসম্পাদক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ‘টাকার বিনিময়ে’ বা ‘খেয়ালখুশিমতো’ এসব পদ দেওয়া নিয়ে দলের অভ্যন্তরেই সমালোচনার মুখে পড়েছিল দলটি। এখন সেই প্রবণতা শুরু হয়েছে ছাত্রলীগে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, গঠনতন্ত্র মেনে তাঁরা শূন্য পদের বিপরীতে এসব পদ দিচ্ছেন। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা এখন কত দাঁড়িয়েছে, তা ছাত্রলীগের নেতারা বলতে পারেননি।

সর্বশেষ ৮ জুন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ছাত্রলীগের সাবেক একজন নেতা কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক হওয়ার ঘোষণা দেন ফেসবুকে। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সই করা চিঠির ছবি ফেসবুকে দেন। চিঠিটি ২০ মে তারিখে সই করা। জানতে চাইলে এই নেতা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যখন দেখেন অনেকেই নতুন পদ পাচ্ছেন, তখন তদবিরের মাধ্যমে নিজের পদ নিশ্চিত করেছেন। তিনি ৮ জুন চিঠিটি হাতে পান।

২০ মে তারিখে সই করা ১৬২ জনকে পদ দেওয়ার চিঠির অনুলিপি প্রথম আলোর হাতে রয়েছে। এ ছাড়া তারিখ উল্লেখ ছাড়াও অনেকের চিঠির অনুলিপি পাওয়া গেছে। গণহারে দেওয়া পদগুলো হচ্ছে নির্বাহী সংসদের ‘উপসম্পাদক’ ও ‘সহসম্পাদক’ এবং ‘কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য’। অবশ্য ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান দাবি করেন, ‘এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই। মোট পদের বাইরে একটা পদও দেওয়া হয়নি।’

২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই ছাত্রলীগের ২৮তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে সাইফুর রহমানকে সভাপতি ও এস এম জাকির হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুসারে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট হওয়ার কথা। সম্মেলনের সাত মাস পর গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ২৭৫ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৬টি পদ শূন্য ছিল। সেগুলো হলো উপসম্পাদক ও সদস্য।

এরপর গত বছরের জুন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বানানো হয়। চলতি বছরের মে মাসে এসে আবার বেশ কয়েকজনকে উপসম্পাদক, সহসম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সদস্য করা হয়েছে। এ অবস্থায় এখন কমিটির সদস্যসংখ্যা কত, তা কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের কাছে কমিটির তালিকা চাইলে তিনি তা দিতে পারেননি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি অনেক বিষয়ে ছাত্রলীগের একাধিক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিগুলো হওয়ার পর থেকে পদবঞ্চিতদের বর্ধিত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু তখন পদ না দিয়ে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে গণহারে পদ দেওয়ার মাধ্যমে সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের পছন্দের লোকদের পদ দিচ্ছেন।

ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদে নতুন করে ৬১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘২৬টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬১টি পদ কীভাবে দেওয়া হলো’—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক পদ খালি হয়েছে। অনেকে বিয়ে করেছেন, অনেকে চাকরিতে গিয়েছেন।

কাদের পদ খালি হয়েছে, সে তালিকা চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি আগামী দু-এক দিনের মধ্যে সেটা প্রকাশ করা হবে বলে জানান।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ১১(খ) ও (গ) ধারায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকাল দুই বছর। এর মধ্যে সম্মেলন না হলে সংসদের কার্যকারিতা লোপ পাবে। বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে বর্ধিত সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে কমিটি তিন মাসের জন্য সময় বাড়াতে পারে।

ছাত্রলীগের সহসভাপতি পর্যায়ের কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকেবলেন, কমিটি দুই বছরের জন্য গঠিত হলেও এর আগে বেশ কয়েকটি কমিটি চার বছরের বেশি সময় অতিবাহিত করেছে। এই কমিটিও সেই ধারাতেই চলছে।

গঠনতন্ত্র অনুসারে, আগামী ২৮ জুলাই বর্তমান কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর দুই মাস আগে থেকে শুরু হয় গণহারে পদ দেওয়া। এর আগের কমিটিও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একই কাজ করেছিল। এবারের সংখ্যা অনেক বেশি বলে সংগঠনের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে যাঁদের পদ দেওয়া হয়েছে, গত সপ্তাহে বর্ধিত সভায় তাঁদের তালিকা করা হয়েছে। যাঁরা এরই মধ্যে চাকরিতে ঢুকেছেন এবং বিয়ে করেছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে কমিটির নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

ভাগ