একটি বুলেটবিদ্ধ রাষ্ট্র

114

বাঙালী জাতির ইতিহাস খুব প্রাচীন। এ জাতির সাথে মিশে আছে বিপ্লব ও প্রেম । বিপ্লবীদের রক্তে স্নাত বাংলার পবিত্রভূমি। বাঙালী জাতিয়তাবাদের জন্মের ইতিহাস খুব দূরের নয়। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে প্রথম বাঙালী জাতিকে দ্বিখণ্ডিত করে ব্রিটিশরা। কারণ তারা জানতো বাঙালী জাতি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। তারা প্রতিবাদ করতে জান, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এবং অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতেও বিপন্ন হয় না। বাঙালি জাতিকে প্রায় সব কালেই লড়াই করতে হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। প্রতি বছর মারাঠা বর্গিরা এসে এ দেশে লুটতরাজ করতো। সামন্ত রাজারা চুষে খেয়েছে এই বাংলার ধন সম্পদ ও ফসলের হাসি। মোঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজা যখন বাংলার নবাব ছিলেন তখন বাংলা ফুঁলে -ফেঁপে ওঠে অর্থ বাণিজ্য ও ধন সম্পদে। বাংলার ধন সম্পদের লোভে ভিড় জমায় সাদা চামড়ার বেনিয়ারা। পলাশির প্রান্তরে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা হারিয়ে বাংলা পড়ে যায় অদল গহ্বরে। এ বাংলা জন্ম দিয়েছে বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবের। বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন, নেতাজী, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, ইলামিত্র, ক্ষুদিরামের মতো বিপ্লবিরা। অবশেষে রক্তের পথ মাড়িয়ে দুশো বছরের ব্রিটিশ পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙে নবোদয় হয় ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটো রাষ্ট্র। আবারো বাংলা ভেঙে দু ভাগ হলো। পশ্চিম বাংলা পেলো ভারত, পূর্ব বাংলা জুটলো পাকিস্তানের ভাগে। নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত কোনো মিল না থাকার পরেও শুধুমাত্র ধর্মের কারণে সোনার বাংলা হলো পাকিস্তানের উপনিবেশ। পাকিস্তানিরা জানতো একটি জাতিকে ধংস করতে হলে সবার আগে মুখের ভাষা রোধ করতে হবে। প্রথম আঘাত আসলো বাংলা ভাষার ওপর। ৫৪ নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্ট জয়ী হয়েও সরকারে থাকতে পারেনি। পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরায়ার্দীও পাক মিলিটারির কবলে পড়ে টিকে থাকতে পারেন নি। সেই জুলুমের প্রতিবাদ শুরু হলো গণ বিষ্ফোরণ। ধাপে ধাপে ৬৬ এলো, ৬৯ এলো ৭০ ওর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্য গরিষ্ঠতা পেয়েও সরকার গঠন করতে পারেনি। পাক জান্তার তালবাহান শুরু হলো। এলো ২৫ মার্চের কালোরাত। হত্যার উৎসব শুরু হলো দেশজুড়ে। কান্না আর রক্তের স্রোতে লাল হলো বাংলা। এক সাগর রক্ত মাড়িয়ে এলো কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

পুরো বিশ্ব দেখলো সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশ গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশ এসেছিলো বাংলার বন্ধু শেখ মুজিবের হাতে। আবেগি মুজিবের চোখের জল তখনও শুকোয় নি। তৈরি হলো অত্যাচারি গুপ্ত ঘাতক সিরাজ শিকদারের বাহিনী। লুণ্ঠিত হতে লাগলো বাংলার ভূমি।

রাষ্ট্রটি তখনও সদ্য জন্ম নেয়া একটি শিশু। পাকিস্তানিরা কিছুই রেখে যায়নি, ব্যংকের ডলার, রেমিটেন্স, অর্থ সম্পত্তি কিছুই ছিলো না। সদ্য তিন বছর পেরোনো শিশু রাষ্ট্রের বুকে আচমকা নেমে এলো এক কালোরাত। রাষ্ট্র হারালো তার পিতাকে। জাতি হারালো তার সূর্য সন্তানকে। ঘাতকেরা মুজিবকে এতোটাই ভয় পেতো যে তার মৃত্যুর পর মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে ক্ষান্ত হয়নি। কূৎসা রটিয়েছে তার পরিবার ও সন্তানদের নামে।

রাষ্ট্র দেখলো তার জনকের বুলেটবিদ্ধ নিথর দেহ। প্রায় ছফুট লম্বা, ব্যাকব্রাশ করা বৃহদাকার মুজিবকে ভয় পেতো ইয়াহিয়ার মতো জাদরেল পশুরাও। সে মুজিব নিহত হলেন তার অনুগত সেনাদেরই হাতে। খুব সচেতনভাবে একদল লোক ব্যালেন্সিংয়ের বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলেন। অথচ এ ঘৃণ্য হতাকারী জাতিররপিতার খুনের অন্যতম কুশীলব। না পাঠক, এ কোনো বানানো গাল গল্প নয়। বঙ্গবন্ধু খুনি মেজর ফারুক, রশিদের স্বীকারোক্তি তাই বলে। পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে আজ ৭১ বছর হলো। এতো দিনেও তারা পারেনি একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়ন করতে। জাতির জনক তা করেছেন মাত্র ১ বছরে। আমাদের দেশ পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশের আগেই ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন করেছে। বিশ্বের অনান্যদেশ তখনও আদিম শিকারে লিপ্ত। ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রচার ও সংস্কৃতি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু নিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ। ঘাত প্রতিঘাত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলা এগিয়ে যাচ্ছিলো।

ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিলো একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন। বুলেট বিদ্ধ হলেন জাতির জনক, বুলেট বিদ্ধ হলো রাষ্ট্র। একটি বুলেট বিদ্ধ রাষ্ট্রের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাংলার ফল ফসলের মাঠ। বাংলার মাটি বাংলার জল আজও সেই বুলেটবিদ্ধ রাষ্ট্রের শোকে শোকাহত। শিশু রাষ্ট্র যার বুকে অগণিত বুলেট…….

লেখক: ফারমিন মৌলী
সাবেক ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ,
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগ,
ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক, নাজিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগ।

ভাগ